হলুদের রাজ্যে বরিশাল, সূর্যমুখীতে নতুন সম্ভাবনা

বরিশালের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন হলুদ রঙের ঝলমলে সূর্যমুখী ফুল চোখে পড়ে। ছবি: আগামীর সময়
বরিশালের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন যেন এক অনন্য দৃশ্য। চারদিকে তাকালেই চোখে পড়ে হলুদ রঙের ঝলমলে সূর্যমুখী ফুল, যেন প্রকৃতি নিজ হাতে সাজিয়েছে এক বিস্তৃত হলুদের রাজ্য। এই সৌন্দর্যের ভেতরেই লুকিয়ে আছে কৃষকের স্বপ্ন, পরিশ্রম আর দেশের অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা।
চলতি মৌসুমে বরিশাল বিভাগে সূর্যমুখী চাষে এসেছে বড় সাফল্য। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ বছর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ হাজার ৫৭৭ হেক্টর জমি, কিন্তু বাস্তবে চাষ হয়েছে ৯ হাজার ২৬৮ হেক্টরে। লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার এই অর্জন শুধু সংখ্যায় নয়, কৃষকদের বাড়তি আগ্রহেরও প্রমাণ। অনুকূল আবহাওয়া, কম খরচ এবং ভালো লাভের সম্ভাবনা- সব মিলিয়ে কৃষকরা ধীরে ধীরে ঝুঁকছেন এই ফসলের দিকে।
বরিশাল অঞ্চলের প্রায় সব জেলায়ই ছড়িয়ে পড়েছে সূর্যমুখীর চাষ। পটুয়াখালীতে সবচেয়ে বেশি, এরপর বরগুনা, ভোলা, পিরোজপুর, ঝালকাঠি ও বরিশাল জেলায়ও বিস্তীর্ণ জমিতে দেখা মিলছে এই সোনালি ফুলের। অনেক কৃষক এবার প্রথমবারের মতো এই চাষে নেমেছেন, আবার অনেকে আগের অভিজ্ঞতায় আরও জমিতে চাষ বাড়িয়েছেন।
বরিশাল সদর উপজেলার চরবাড়িয়া এলাকার কৃষক কায়ছার আলম জানালেন, প্রতি বছরই তিনি সূর্যমুখী চাষ করেন, তবে এবার পাশের জমিতেও চাষ বাড়িয়েছেন। লাভের আশায় আগ্রহও বেড়েছে তার।
বাবুগঞ্জের কৃষক স্বপন দাসের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানিয়েছেন, আগে যে জমি পরিত্যক্ত ছিল, এখন সেখানে সূর্যমুখী চাষ করে লাভবান হচ্ছেন তিনি। আর পটুয়াখালীর কলাপাড়ার কৃষক সাইফুল গাজী পাঁচ বছর ধরে বড় পরিসরে এই চাষ করে আসছেন। তার ভাষ্য মতে, খরচ কম, লাভ বেশি- এই হিসাবই তাকে ধরে রেখেছে সূর্যমুখীর মাঠে। এমনকি কোম্পানির লোকজন এসে সরাসরি বীজ কিনে নিয়ে যাওয়ায় বাজার নিয়ে চিন্তাও কম।
কৃষকদের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে, মাত্র ২ হাজার ৫০০ টাকার বীজ থেকে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার তেল পাওয়া সম্ভব। ফলে সূর্যমুখী এখন শুধু একটি ফসল নয়, হয়ে উঠছে সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক বিকল্প।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ড. নজরুল ইসলাম সিকদার মনে করেন, সূর্যমুখী বাংলাদেশের ভোজ্য তেলের বাজারে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। বরিশাল অঞ্চলে ইতোমধ্যেই এই ফুল থেকে তেল উৎপাদন শুরু হয়েছে, যা আমদানিনির্ভরতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কৃষকদের আগ্রহ ধরে রাখতে পারলে আগামী দিনে এই চাষ আরও বিস্তৃত হবে বলে আশা তার।
এই সূর্যমুখীর মাঠ এখন শুধু কৃষকের আয়ের উৎস নয়, হয়ে উঠেছে প্রকৃতিপ্রেমীদেরও এক নতুন গন্তব্য। ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার দপদপিয়া ইউনিয়নের বাগানগুলোতে প্রতিদিন ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। কেউ দল বেঁধে ঘুরতে আসছেন, কেউ ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করছেন, আবার কেউ নিঃশব্দে উপভোগ করছেন প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য।
অনেকেই বলছেন, সূর্যমুখীর বাগানে ঢুকলেই মনে হয় যেন হলুদের এক স্বপ্নরাজ্যে প্রবেশ করা হয়েছে। চারপাশে ফুলের সমুদ্র, তার ভেতরে উড়ে বেড়ানো মৌমাছি- সব মিলিয়ে এক জীবন্ত চিত্রকল্প। বড় বাগানে দাঁড়ালে সেই দৃশ্য যেন স্বর্গের মতো লাগে।
বরিশালের এই হলুদ বিপ্লব শুধু চোখের আরাম নয়, এটি কৃষকের স্বপ্নের বাস্তবতা, অর্থনীতির সম্ভাবনার নতুন দরজা। এটি দেশের আত্মনির্ভরতার পথে এক উজ্জ্বল পদক্ষেপ।

