আগামীর সময়

রূপপুরে ঈদেও কর্মব্যস্ততা, আইএইএর সঙ্গে নতুন চুক্তি সই

রূপপুরে ঈদেও কর্মব্যস্ততা, আইএইএর সঙ্গে নতুন চুক্তি সই

দেশের জ্বালানিখাতে ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জিত হতে যাচ্ছে আগামী মাসে। পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ৭ এপ্রিল থেকে শুরু হতে যাচ্ছে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম। শুরুর প্রস্তুতি হিসেবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সঙ্গে নতুন চুক্তি সই করেছে বাংলাদেশ।

এদিকে, জ্বালানি লোডিংয়ের প্রস্তুতি নিতে বাতিল করা হয়েছে প্রকল্প এলাকার সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ঈদের ছুটি। সেখানে এখন চরম কর্মব্যস্ততা।

গত ১৮ মার্চ অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) সঙ্গে পঞ্চম ‘কান্ট্রি প্রোগ্রাম ফ্রেমওয়ার্ক’ (সিপিএফ) চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ সরকার।

বাংলাদেশের পক্ষে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন এবং আইএইএ-এর পক্ষে সংস্থাটির উপ-মহাপরিচালক ও টেকনিক্যাল কো-অপারেশন বিভাগের প্রধান হুয়া লিউ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।

২০২৬ থেকে ২০৩২ সাল পর্যন্ত মেয়াদী এই চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো পারমাণবিক প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা। শুক্রবার রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তথ্যগুলো জানিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. তানভীর মিয়া।

সিপিএফ হলো আইএইএ এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে প্রযুক্তিগত সহযোগিতার একটি মধ্যমেয়াদী পরিকল্পনা কাঠামো। পরবর্তী ছয় বছরের জন্য পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সাতটি বিষয়কে অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

সেগুলো হলো- পারমাণবিক ও বিকিরণ সুরক্ষা এবং নিরাপত্তা, জ্বালানি, খাদ্য ও কৃষি, জনস্বাস্থ্য, পানি ও পরিবেশ, পারমাণবিক জ্ঞান উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা এবং শিল্পক্ষেত্রে রেডিয়েশন প্রযুক্তির ব্যবহার।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সদ্য স্বাক্ষরিত এই সিপিএফ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো, যা সরাসরি রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আসন্ন কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়তা করবে। এই ফ্রেমওয়ার্ক বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশে পারমাণবিক প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার আরও সম্প্রসারিত হবে।

​১৯৭২ সাল থেকে বাংলাদেশ আইএইএ-র সদস্য। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, সহযোগিতার এই নতুন পর্যায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পকে সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত মানদণ্ড অনুযায়ী পরিচালনায় সহায়ক হবে।


রূপপুর ঘিরে ব্যস্ততা ও উচ্ছ্বাস

জ্বালানি লোডিং উদ্বোধনের প্রস্তুতি নিতে ঈদের দিনেও কর্মব্যস্ত পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এলাকা। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঈদসহ সব ছুটি বাতিল হয়েছে। ইউনিট-১ এর সব প্রস্তুতিমূলক কাজ আগামী ২৭ মার্চের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

জ্বালানি লোডিং ও বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর খবরে স্থানীয়রা বেশ উচ্ছ্বসিত।

সলিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আতিয়ার রহমান বললেন, ‘স্থানীয় জনগণের বহুদিনের প্রত্যাশিত রূপপুর প্রকল্পে জ্বালানি লোডিং হয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হতে যাচ্ছে শুনে আমি এবং আমার এলাকার জনগণ খুবই আনন্দিত। এজন্য আমি সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে স্থানীয় জনগণের পক্ষ হতে ধন্যবাদ জানাই।তিনি ক্ষমতা গ্রহণের অল্প সময়ের মধ্যে বর্তমান পরিস্থিতিতে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এটি সময়োপযোগী ও গুরত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বলে আমি মনে করি।’

‘আমাদের দীর্ঘদিনের বহু আকাঙ্খিত স্বপ্নের প্রকল্প বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে যাচ্ছে। এই প্রকল্প নিয়ে অনেক বিরূপ কথা শুনেছি যে, আণবিকের কারণে কৃষিতে ব্যাপক ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে। আসলে বাস্তবতা কী সেটা আমরা এবারে উপলব্ধি করতে পারব যে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ বিশাল অরণ্যের মধ্যে কৃষিতে কোন ক্ষতির কারণ না-বরং কৃষি বিপ্লবে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষিতে শুধু বিদ্যুতই আসবে না, এখান থেকে আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে আমাদের কৃষিকে আরও উন্নয়ন করতে পারব বলে আমার বিশ্বাস।’ এই অভিমত জাতীয় পদক পাওয়া কৃষক আব্দুল জলিল কিতাব মন্ডল ওরফে লিচু কিতাবের।

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সংকটের মধ্যে এই প্রকল্প চালু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন ঈশ্বরদী পৌরসভা ব্লকের উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা সুজন রায়।

‘ইরান-ইসরায়েল-আমেরিকার মধ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বলানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। চলমান রবিশস্য মৌসুমে এবং বোরো আবাদের জন্য কৃষকরা জ্বালানি তেলের জন্য হাহাকার করছে। এই সময়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প চালু সময়োচিত সিদ্ধান্ত । এতে দেশের কৃষকরা খুবই উকৃত হবে বলে আমি মনে করি।’

উদ্বোধন ৭ এপ্রিল

​বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী ৭ এপ্রিল ভার্চুয়ালি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন।

সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, চলতি বছরের জুলাই মাসের মধ্যেই এ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বুধবার (১৮ মার্চ) বিকেলে বলেছিলেন, জ্বালানি লোডিংয়ের সময় আইএইএ এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল উপস্থিত থাকবে।

নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জায়েদুল হাসান সেদিন বলেছিলেন, ‘ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতিমূলক কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও সেফগার্ডকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ফিজিক্যাল স্টার্টআপ তথা জ্বালানি লোডিংয়ের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।’

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে রাশিয়ার ভিভিইআর-১২০০ মডেলের তৃতীয় প্রজন্মের দুটি রিয়্যাক্টর স্থাপন করা হচ্ছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ১,২০০ মেগাওয়াট, যা মিলিয়ে মোট উৎপাদন ক্ষমতা দাঁড়াবে ২,৪০০ মেগাওয়াট।

রিয়্যাক্টরগুলো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান পূরণে সক্ষম বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম।

    শেয়ার করুন: