আগামীর সময়

হাম কী, কেন হয় ও যে সকল বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে

হাম কী, কেন হয় ও যে সকল বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে

সম্প্রতি ঢাকা, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, পাবনা কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে শিশুদের জ্বর, কাশি ও শরীরে লালচে র‍্যাশ নিয়ে অভিভাবকরা ভিড় করছেন।

শিশুদের পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, এবং কিছু শিশু মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি নিয়ে শিশুচিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, প্রশাসনসহ সবাই উদ্বিগ্ন। এই প্রেক্ষাপটে জানা থাকা জরুরি, হাম কী, কেন ও কীভাবে ছড়ায় এবং শিশুর হাম হলে কী করণীয়।

হাম আসলে কী?
হাম মূলত ‘রুবেলা’ নামের এক অতিসংক্রামক ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত রোগ। সাধারণত ৯ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। হামের প্রাথমিক উপসর্গ হলো হঠাৎ জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং চোখের লালচে ভাব। জ্বরের ৩–৪ দিনের মধ্যে মুখ থেকে শুরু করে পুরো শরীরে লালচে র‍্যাশ দেখা দেয়।

এই রুবেলা ভাইরাসটি শ্বাসনালীর মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে এবং শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা সাময়িকভাবে কমিয়ে দেয়। ফলে হাম আক্রান্ত শিশুর শরীর অন্যান্য জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের জন্য সংবেদনশীল হয়ে যায়।

যে সকল জটিলতা দেখা যায়
হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে পরবর্তী সময়ে নিউমোনিয়া, মারাত্মক ডায়রিয়া, অপুষ্টি, কানপাকা, মুখে ঘা, মস্তিষ্কের প্রদাহসহ নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে। এছাড়া হামে আক্রান্ত শিশুর শরীরে ভিটামিন এ–এর মাত্রা কমে যায়, যার ফলে চোখের পানি কমে যায়, চোখ শুষ্ক হয়ে যায় এবং দীর্ঘমেয়াদে রাতকানা বা অন্ধত্ব পর্যন্ত ঘটতে পারে।

হামের লক্ষণ
হামের ভাইরাস শরীরে প্রবেশের ১০ থেকে ১৪ দিন পর লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়। প্রধান লক্ষণগুলো হলো:

*তীব্র জ্বর এবং সারা শরীরে ম্যাজম্যাজ করা বা ব্যথা অনুভূত হওয়া।
*চোখ-মুখ ফুলে যাওয়া এবং চোখ লাল হয়ে পানি পড়া।
*নাক দিয়ে পানি পড়া এবং ঘনঘন হাঁচি হওয়া।
*শরীরে ছোট ছোট লালচে দানা বা র‍্যাশ দেখা দেওয়া, যা দ্রুত কপাল থেকে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
*অরুচি বা কিছু খেতে না চাওয়া এবং চরম শারীরিক দুর্বলতা।

হাম হলে কী করতে হবে?
হামের লক্ষণ দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। চিকিৎসক শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে নিশ্চিত করবেন এটি হাম কিনা। সাধারণত সঠিক যত্নে ৩ দিনের মধ্যে জ্বর কমে আসে এবং ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে রোগী সুস্থ হয়ে ওঠে।

আক্রান্ত রোগীকে নিয়মিত হালকা গরম পানিতে গোসল করানো যেতে পারে। জ্বর বেশি থাকলে পরিষ্কার ভেজা তোয়ালে বা নরম কাপড় দিয়ে বারবার শরীর মুছিয়ে দিতে হবে। বমি বা বেশি দুর্বলতা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করতে হবে; নিজে থেকে কোনো অ্যান্টিবায়োটিক বা ওষুধ শুরু করা উচিত নয়।

বিশ্রাম ও পুষ্টি
হাম আক্রান্ত রোগীর জন্য পূর্ণ বিশ্রাম অপরিহার্য। সংক্রমণের বিস্তার রুখতে রোগীকে আলাদা ঘরে রাখা এবং ঘর থেকে বের না হওয়াই ভালো। এ সময় শরীর থেকে প্রচুর পানি বেরিয়ে যায়, তাই প্রচুর পরিমাণে পানি, ফলের রস এবং তরল খাবার দিতে হবে। স্বাভাবিক খাবারের পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবার দ্রুত আরোগ্য লাভে সহায়তা করে।


চিকিৎসা না নিলেই ঝুঁকি

সময়মতো হামের চিকিৎসা বা যত্ন না নিলে এটি শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এর ফলে নানা ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে, যেমন:

নিউমোনিয়া: ফুসফুসের মারাত্মক সংক্রমণ।
কানের ইনফেকশন: যা থেকে শ্রবণশক্তি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
মস্তিষ্কের জটিলতা: এনসেফালাইটিস বা মেনিনজাইটিস (মস্তিষ্কের প্রদাহ), যা অত্যন্ত জীবনঘাতী হতে পারে।

হামের টিকা

বাংলাদেশে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির অংশ হিসেবে ‘এমআর’ (মিজলস–রুবেলা) টিকা দুটি ডোজে দেওয়া হয়। প্রথম ডোজ ৯ মাস বয়সে এবং দ্বিতীয় ১৫ মাস বয়সে। ২০২৫ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ৮৮ শতাংশ দুই ডোজ টিকা নিয়েছে। টিকা নেওয়ার পর শিশুরা প্রায় সারা জীবনের জন্য হামের সংক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকে।

শিশুদের ৯ মাস এবং ১৫ মাস বয়সে হামের টিকার দুটি ডোজ সম্পন্ন করা এবং যেকোনো উপসর্গে দ্রুত বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। সঠিক সচেতনতাই পারে আপনার শিশুকে হামের হাত থেকে রক্ষা করতে।


    শেয়ার করুন: