হাম
ঢাকার এক হাসপাতালেই ২১ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত বেশি রাজশাহীতে

ছবিঃ আগামীর সময়
জ্বর, কাশি ও শরীরে লালচে র্যাশে আক্রান্ত শিশু নিয়ে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলার হাসপাতালে বাড়ছে অভিভাবকদের ভিড়। পরীক্ষায় অনেকের দেহে শনাক্ত হচ্ছে হাম। আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে শিশুর মৃত্যুর ঘটনাও বেড়েছে চলতি মাসে।
স্বাস্থ্য বিভাগসূত্রে জানা গেছে, অন্তত ১০টি জেলায় দেখা দিয়েছে হামের প্রকোপ। রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত এ রোগে ২২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. শ্রীবাস পাল জানালেন, এ বছর হাম আক্রান্ত ছয় শতাধিক রোগী এখানে চিকিৎসা নিয়েছে। মার্চই ভর্তি রোগীর সংখ্য পাঁচ শতাধিক।
চলতি মাসে সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের খবর এসেছে রাজশাহী বিভাগ থেকে। রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য অফিসের তথ্য, গত কয়েক মাসে তিন জেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে অন্তত ৪৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই মারা গেছে ২৯ জন। এর মধ্যে রাজশাহী সিটির একজন আর পাবনার দুই শিশুর হাম শনাক্ত হয়েছিল।
মার্চে এ বিভাগের ৩৪২ জনকে হামে আক্রান্ত সন্দেহ করা হয়েছে, যার মধ্যে শনাক্তের হার ২২ দশমিক ৫১ শতাংশ। জেলাভিত্তিক শনাক্তের চিত্রে শীর্ষে আছে পাবনা। সেখানে ৩৩ জনের দেহে মিলেছে এই ভাইরাস। এরপর চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২০ জন, রাজশাহীতে ১০ জন, নাটোরে ৬ জন, নওগাঁয় ৫ জন এবং বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও রাজশাহী সিটি এলাকায় একজন করে হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। তথ্যগুলো দিয়েছেন রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান।
বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় ১৬৭ সন্দেহভাজন রোগীর মধ্যে নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ১৩১ জনের। এর মধ্যে ৩৯ জনের হাম এবং ২ জনের রুবেলা শনাক্ত হয়েছে। বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে, আক্রান্তদের মধ্যে বিভিন্ন জেলার জেনারেল হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি ৪৭ জন। চারজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
চলতি বছরের শুরু থেকে সোমবার পর্যন্ত হাম-রুবেলায় আক্রান্ত হয়ে এ বিভাগে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।
জেলা ভিত্তিক পরিসংখ্যান বলছে, সন্দেহভাজন রোগীদের মধ্যে বরগুনায় ১৬ জনের হাম ও একজনের রুবেলা শনাক্ত হয়েছে। সেখানে একজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১৪ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বরিশাল জেলায় ৫ জনের হাম ও একজনের রুবেলা শনাক্ত হয়েছে। আর সিটি করপোরেশন এলাকায় শনাক্ত হয়েছে হামে আক্রান্ত ৭ রোগী। এই এলাকায় এখন পর্যন্ত ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এছাড়া, ভোলায় ৩ জন, ঝালকাঠিতে ৫ জন পটুয়াখালীতে ২ জন ও পিরোজপুরে একজনের হাম শনাক্ত হয়েছে।
ময়মনসিংহের স্বাস্থ্য বিভাগীয় পরিচালক ডাক্তার প্রদীপ কুমার সাহা জানান, বিভাগে এ পর্যন্ত সম্ভাব্য আক্রান্ত হয়েছে ১৫৬ জন । এদের মাঝে হাম শনাক্ত হয়েছে ৫৭ জনের আর মৃত্যু হয়েছে পাঁচজনের। অন্যদিকে, খুলনা বিভাগে চলতি বছর হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ৭৮ জন, যার মধ্যে কুষ্টিয়ার রোগীই বেশি। তবে এ বিভাগে এখন পর্যন্ত হামে বা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর কোনো ঘটনা নেই।
এ রোগে আক্রান্তদের বেশিরভাগই শিশু, যাদের বয়স ছয় থেকে নয় মাস।
‘হাম রোগের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে জ্বর, সর্দি, কাশি ও চোখ লাল হয়ে যাওয়া দেখা যায়। পরে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি বা র্যাশ ছড়িয়ে পড়ে। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে এটি জটিল আকার ধারণ করতে পারে’- ব্যাখ্যা করলেন বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. এ কে এম নাজমুল আহসান।
হাসপাতালটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. এ কে এম মশিউল মুনীর বললেন, ‘হামের টিকা সাধারণত শিশুদের ৯ মাস বয়স হলে দেওয়া হয়। কিন্তু ইদানিং ৭ মাস বয়সেই শিশুরা এ রোগটিতে আক্রান্ত হচ্ছে।’
‘হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়। ফলে আক্রান্ত শিশুরা নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন জটিলতায় ভুগতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে সুস্থ হওয়ার পরও বারবার সংক্রমণ দেখা দেয়’- সতর্ক করলেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. বেনজীর আহম্মেদ।
এ বিভাগের প্রধান ডা. শাহীদা ইয়াসমিন জানালেন, সেখানে জানুয়ারিতে প্রথম রোগী শনাক্ত হয়। শুরুতে সীমিতভাবে চিকিৎসা দেওয়া হলেও বর্তমানে হাসপাতালের ১০ ও ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে আইসোলেশন কর্নার চালু করা হয়েছে।
‘আক্রান্তদের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশই ৬ মাসের কম বয়সী শিশু, যা পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকলে আইসোলেশন ব্যবস্থায় চাপ আরও বাড়তে পারে’- আশঙ্কা ডা. শাহীদার।
হঠাৎ করে হাম ও রুবেলা রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধানে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু হয়েছে, জানালেন বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রে আলাদা ওয়ার্ড খোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাজশাহী জেলা সিভিল সার্জন ডা. এস আই এম রাজিউল করিম জানালেন, আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত ও আইসোলেশনে রাখার জন্য অনুসন্ধানী দল সক্রিয় করা হয়েছে।
টিকাদান ক্যাম্পেইন নির্ধারিত সময়ে না হওয়ায় হঠাৎ সংক্রমণ বেড়েছে বলে মনে করছেন রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান।
‘সাধারণত চার বছর পরপর হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হয়। সবশেষ ২০২১ সালে এই কর্মসূচি হয়। ২০২৫ সালে নতুন ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় অনেক শিশু টিকার বাইরে থেকে গেছে, যা প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।’
একই মত খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের পরিচালক ডা. মো. মুজিবুর রহমানের। হাম মোকাবিলায় টিকা কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি বলে জানালেন তিনি।
শিশুর মধ্যে জ্বর ও র্যাশ দেখামাত্র হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দিলেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. গোলাম মাওলা। জেলা সিভিল সার্জন ফয়সাল আহমেদ জানালেন, সব স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে এ বিষয়ে সচেতন করা হচ্ছে। প্রতিটি উপজেলায় তিনটি করে আইসোলেশন বেড তৈরি আছে। তিনজন চিকিৎসকের একটি কমিটিও করা হয়েছে।
৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে হাম-রুবেলা টিকা নিশ্চিত করাই এ রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় বলে মনে করছেন বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ও শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. এ কে এম নাজমুল আহসান।
পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, পুষ্টিকর খাবার, বিশেষ করে প্রোটিনযুক্ত খাবার এবং দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।
এদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল আজ জানালেন, হামসহ ৬ রোগের টিকা কিনতে সরকারের বরাদ্দ ৬০৪ কোটি টাকা এরইমধ্যে দেয়া হয়েছে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফকে। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই টিকা চলে আসবে বলে আশা করছেন তিনি। হাম নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বানও জানালেন মন্ত্রী।
প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছে আগামীর সময়ের রাজশাহী, বরিশাল, ময়মনসিংহ ও খুলনার ব্যুরো অফিস।

