প্রথম একনেক সভায় ১৭ প্রকল্প, উঠছে না পদ্মা ব্যারেজ
- করতোয়া নদী বাঁচাতে ১১২২ কোটি টাকা

ফাইল ছবি
বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের প্রথম জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে ৬ এপ্রিল। এতে বগুড়ার করতোয়া নদী বাঁচাতে উঠছে ১ হাজার ১২২ কোটি টাকার প্রকল্প। সেই সঙ্গে নতুন ও চলমানসহ উন্নয়ন প্রকল্প উপস্থাপন করা হচ্ছে মোট ১৭টি।
বহুল আলোচিত পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পটি উপস্থাপন হচ্ছে না দুই কারণে— প্রথমত, চলমান সংকটের মধ্যে এত বেশি ব্যয়ের প্রকল্প নেওয়া হবে কিনা তা নিয়ে রয়েছে দ্বিধা। দ্বিতীয়ত— প্রথম একনেক বৈঠক হওয়ায় শুরুতেই এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে না চাওয়া। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠেয় বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমান।
সূত্র জানায়, একনেকের জন্য প্রকল্প বাঁছাই করতে আজ (৩০ মার্চ) একটি বৈঠক করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অংশ নেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, পরিকল্পনা সচিব এসএম শাকিল আকতারসহ পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যরা।
‘পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প নিয়ে আলোচনাই হয়নি। তবে অন্য ১৭টি প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এগুলো একনেক উপস্থাপনের জন্য সম্মতি দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী। মঙ্গলবার এ বিষয়ে নোটিশ জারি করতে পারে পরিকল্পনা কমিশন’— জানিয়েছেন বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক কর্মকর্তা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা আগামীর সময়কে বলছিলেন, মূলত দুই কারণে এই মুহূর্তে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প আলোচনা করা হয়নি। একটি হলো বর্তমান চলমান সংকটের মধ্যে ৩৪ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের প্রকল্প নেওয়াটা কতটা যৌক্তিক হবে। দুই প্রথম একনেক বৈঠক হওয়ায় এটি উপস্থাপনের প্রস্তাব দেওয়াটাই ঠিক মনে হচ্ছে না। ফলে সমস্ত প্রস্তুতি চূড়ান্ত করার পরও এই একনেক উপস্থাপন হচ্ছে না।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একনেকে উঠতে যাওয়া ‘করতোয়া নদী সিস্টেম উন্নয়ন’ প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ১২২ কোটি ১৫ লাখ টাকা। সম্পূর্ণ সরকারি তহবিলের অর্থে এটির প্রস্তাব করেছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে চলতি বছর হতে শুরু হয়ে ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো)।
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, করতোয়া, ইছামতি ও গজারিয়া নদী পুনঃখননের মাধ্যমে করতোয়া নদী সিস্টেমকে পুনরুজ্জীবিত করা হবে। গাইবান্ধা ও বগুড়া জেলার প্রকল্প এলাকায় সেচ সুবিধা দেওয়া, নিষ্কাশন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং তীর প্রতিরক্ষা কাজের মাধ্যমে করতোয়া নদীর ডান ও বাম তীর ভাঙন, দখল ও দূষণ রোধ করা হবে। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির পুর্নভরণসহ পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে সেচ সুবিধা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও মৎস্য চাষের উন্নয়ন করা হবে। প্রকল্পের আওতায় করতোয়া, ইছামতি ও গজারিয়া নদীর ২৩০ কিলোমিটার পুনঃখননের মাধ্যমে করতোয়া নদী সিস্টেমকে পুনরুজ্জীবিত করা হবে। এটি রাজশাহী বিভাগের বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ, বগুড়া সদর, শাজাহানপুর, দুপচাচিয়া, আদমদিঘী, গাবতলী, ধুনট ও শেরপুর উপজেলা এবং রংপুর বিভাগের গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় করা হবে বাস্তবায়ন।
প্রকল্পের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলাধীন খুলশী নামক স্থানে করতোয়া নদীর অফটেক অংশে পলি পড়ে পুরোপুরি ভরাট হয়ে গেছে। ফলে কাটাখালি নদী থেকে কোন পানি প্রবাহ করতোয়া নদীতে প্রবেশ করতে পারে না। ওই এলাকায় করতোয়া নদীটি বর্তমানে মরা নদীতে পরিণত হয়েছে। বগুড়া জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করতোয়া নদীটি বর্তমানে মৃতপ্রায়। বগুড়া শহরে নদীটি দখল ও দূষণে জর্জরিত। বগুড়া শহরাংশে অবস্থিত করতোয়া নদীর ডান ও বাম তীরে ভাঙ্গন, দখল ও দূষণ রোধ এবং নদীর শেষ সীমানা নির্ধারণ কাজের মাধ্যমে শহরের বিভিন্ন ঘর-বাড়ি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসহ নদী তীর রক্ষা করা সম্ভব হবে। এছাড়া প্রকল্প এলাকার ভূগর্ভস্থ পানির পুর্নভরণসহ পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে সেচ সুবিধা, কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। এমন প্রেক্ষাপটে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে প্রকল্পটির।
প্রকল্পটির পটভূমি সম্পর্কে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় জানায়, করতোয়া নদীটি পূর্ব তিস্তা নদীর তিনটি শাখা নদীর অন্যতম এবং সর্ব পূর্বে অবস্থিত। অন্য দুটি শাখা আত্রাই ও পুনর্ভবা নামে পরিচিত। ১৯৮৭ সালে সংগঠিত এক ভয়াবহ বন্যার কারণে তিস্তা নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়। ফলে তিস্তা নদীটি দক্ষিণ পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত হয়।
অন্যদিকে তিস্তার শাখা নদী সমূহের মুখে অত্যধিক পলি পতনের কারণে করতোয়া নদীটি এর পানির মূল উৎস তিস্তা হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বর্তমানে নদীটি রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা ও বগুড়া জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বগুড়া জেলার শেরপুর উপজেলার খানপুর নামক স্থানে বাঙালি নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে করতোয়া নামে প্রবহমান। মূল নদী তিস্তা হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কারণে বর্তমানে করতোয়া নদীর প্রবাহ মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভরশীল। বর্ষা মৌসুম ছাড়া বছরের অধিকাংশ সময়ই লোয়ার করতোয়া নদীতে কোনো পানি প্রবাহ থাকে না।
এছাড়া অসাধু মহলের দখল, নদী ভরাটকরণ ও দূষণ নদীটির অস্তিত্বকে সংকটাপন্ন করে তুলেছে। পাশাপাশি করতোয়া নদীতে প্রবাহ না থাকায় করতোয়ার শাখা নদী ইছামতি ও গজারিয়া নদীতেও পানি প্রবাহ কমেছে। এ সব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এবং স্থানীয় জনসাধারণের দাবির প্রেক্ষিতে গজারিয়া নদী পুনঃখনন কাজ অন্তর্ভুক্ত করে এ প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়।
প্রকল্পের প্রধান প্রধান কার্যক্রম সম্পর্কে বলা হয়েছে, ৬ কিলোমিটার স্লোপ প্রটেকশন কাজ করা হবে। এছাড়া ৩ দশমিক ৫৮ কিলোমিটার তীর প্রতিরক্ষা কাজ, ২৩০ কিলোমিটার পুনঃখনন, দশমিক ৯৯ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ, একটি পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো নির্মাণ এবং ১২১টি ব্রিজের ফাউন্ডেশন ট্রিটমেন্ট দেওয়া হবে।
একনেকে উঠতে যাওয়া অন্যান্য প্রকল্প
সার্বজনীন সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন, ব্যয় ১ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। অংশীদারিত্বমূলক উন্নয়ন প্রকল্প, ব্যয় ৫৯৫ কোটি টাকা। চর ডেভেলপমেন্ট এন্ড সেটেলমেন্ট প্রজেক্ট, ৪ কোটি টাকা। আইটি ট্রেনিং এন্ড ইনকিউবেশন সেন্টার স্থাপন, ৬০ কোটি টাকা। শিশু ও মাতৃ স্বাস্থ্য উন্নয়নে ৮ বিভাগীয় শহরে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডায়াগনস্টিক সেন্টার স্থাপন, ১ হাজার ২১৩ কোটি টাকা। গোপালগঞ্জ ডেন্টাল কলেজ হাসপাতাল উন্নয়ন, ১৩৯ কোটি টাকা। সচিবালয়ে ২১ তলা ভবন নির্মাণ, ৬৪৯ কোটি টাকা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অবকাঠামো উন্নয়ন, ১ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্ন কর্মীদের আবাসিক ভবন তৈরি, ৩০৯ কোটি টাকা। ঢাকা শহরের জরুরি পানি সরবরাহে ৯২০ কোটি টাকা। সাভার সেনানিবাসে সৈনিকদের আবাসন সংকট নিরসনে ব্যারাক নির্মাণে ৩৮৫ কোটি টাকা।
বৈরাগীপুর-টুমচর-বাউফল জেলা সড়ক উন্নয়নে ৩১৯ কোটি টাকা। বরিশাল-ভোলা-পিরাজপুর জেলা সড়কের বরিশাল থেকে ইলিশা ঘাট পর্যন্ত উন্নয়ন, ৫০২ কোটি টাকা। সীমান্ত সড়ক নির্মাণে ৩ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা এবং ময়মনসিংহ বিভাগের ৫টি জেলায় জলবায়ূসহনশীল সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১০৯ কোটি টাকা।
একনেক উঠছে না পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প
নতুন সরকারের প্রথম একনেকে উঠছে না বহুল আলোচিত ‘পদ্মা ব্যারেজ’ প্রকল্প। সব প্রস্তুতি শেষ হলেও আপাতত একনেকে উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেই। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার কোটি ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা। পদ্মা ব্যারেজ (১ম পর্যায়) প্রকল্পটি প্রস্তাব করেছে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়। একনেকে অনুমোদন পেলে চলতি বছর থেকে শুরু করে ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো)।
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে জনানো হয়েছে, শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীতে পানি সংরক্ষণ করে পানির প্রবাহ বৃদ্ধি করা হবে। এর মাধ্যমে পদ্মা নির্ভর এলাকার নদী সিস্টেমকে পুনরুজ্জীবিতকরণসহ লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ কমানো, সুন্দরবন ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য পুনরুদ্ধার, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও জলাবদ্ধতা কমানো এবং বৃদ্ধি করা হবে সেচ সুবিধা।
প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, ৫টি নদী সিস্টেম (হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতি নদী) বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে (সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট জেলা) লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ কমিয়ে স্বাদু পানি সরবরাহ নিশ্চিত করে সুন্দরবন ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করা। পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য ও বনসম্পদ সংরক্ষণ, জলাবদ্ধতা কমানো এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোর পলি অপসারণ করে যশোরের ভবদহসহ অন্যান্য এলাকার পানি নিষ্কাশন করা হবে— উল্লেখ করা হয়েছে প্রকল্পের উদ্দেশ্যে।

