রাষ্ট্রের সংস্কার নয়, বরং বয়ানের মেরুকরণ মাত্র

রাষ্ট্রের ইতিহাসে এমন কিছু সময় আসে, যখন একটি দেশের রাজনীতি কেবল ক্ষমতার পালাবদলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং রাষ্ট্র নিজেকেই নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করে। কিন্তু ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলে, রাষ্ট্রকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার এই বাসনা প্রায়শই দ্রুত গণ-অসন্তোষের কারণ হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও এক উচ্চাভিলাষী প্রকল্প নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো পুনর্বিবেচনা, রাজনীতির আমূল সংস্কার এবং ইতিহাসের প্রচলিত বয়ান পুনর্মূল্যায়ন—এই তিনটি লক্ষ্যই ছিল সরকারের মূল এজেন্ডা। কিন্তু যত সময় গেছে, দেখা গেল এই তিন ক্ষেত্রেই প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান অনেক। আর এই ব্যবধানই সরকারের অজনপ্রিয়তার অন্যতম প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে।
এই অজনপ্রিয়তার মূলে রয়েছে ‘বয়ানের রাজনীতি’। বাংলাদেশে দীর্ঘ দেড় দশক ধরে আওয়ামী লীগ যে একরৈখিক এবং অনেক ক্ষেত্রে জবরদস্তিমূলক ঐতিহাসিক বয়ান প্রতিষ্ঠিত করেছিল, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর মানুষ তার থেকে মুক্তি চেয়েছিল। কিন্তু সেই মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করতে গিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার কি অন্য কোনো উগ্র বা প্রতিশোধমূলক বয়ানের ফাঁদে পা দিয়েছে? এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলা জরুরি— অন্তর্বর্তী সরকার কি আসলেই রাষ্ট্রের সংস্কার চেয়েছে, নাকি আওয়ামী লীগের চাপিয়ে দেওয়া বয়ানের বিপরীতে জামায়াত ও ডানপন্থী দলগুলোর দীর্ঘদিনের অবদমিত ন্যারেটিভের একটি ‘প্রতিশোধমূলক সংস্করণ’ বাস্তবায়ন করে গেছে?
মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্র করে গত ১৫ বছরে যে অতি-বন্দনা ও মিথ তৈরি করা হয়েছিল, তার ভাঙন ছিল অনিবার্য। কিন্তু সেই ভাঙন যখন কেবল ঘৃণা বা অস্বীকারের মোড়কে উপস্থাপিত হয়, তখন তা সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করে। মুজিব ইজ রিয়েল, বঙ্গবন্ধু ইজ রিয়েল—এই সত্য যেমন অনস্বীকার্য, তেমনি শেখ হাসিনার শাসনামলে তাকে যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, সেই ঘৃণাও রিয়েল। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন রাষ্ট্র তার সামগ্রিক ইতিহাসকে সুরক্ষা না দিয়ে কেবল একটি বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠীর ন্যারেটিভকে বৈধতা দিতে শুরু করে।
গতকাল ৭ মার্চ পালন করতে না দেওয়া, এমনকি গ্রেপ্তারের ঘটনা দেখলাম আমরা। সাত মার্চ পালনকারীদের বিরুদ্ধে শিবির ও তার প্রক্সি সংগঠনগুলোর ‘মব’ দেখলাম। আরো দেখলাম, ভাঙা ৩২ নম্বরে ফুল দিতে গিয়ে পুলিশি বাধার মুখে পড়তে হলো কতিপয়কে।
জাতীয় দিবসগুলো কাটছাঁট করার সিদ্ধান্তগুলো অনেক ক্ষেত্রেই সংস্কারের চেয়ে বেশি ‘প্রতিশোধ’ হিসেবে ধরা দিয়েছে। যেখানে সাত মার্চ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অংশ, সেখানে দিবসটি বাতিলে অন্তর্বর্তী সরকারের উৎসাহ লক্ষ্যনীয় ছিল। জামায়াত বা সমমনা দলগুলোর যে ন্যারেটিভ গত ৫০ বছর ধরে কোণঠাসা ছিল, ড. ইউনূসের সরকার কি সেই বয়ানের মুখপাত্র হয়ে উঠেছিল? যদি তাই হয়, তবে এটি রাষ্ট্রের সংস্কার নয়, বরং বয়ানের মেরুকরণ মাত্র।
অন্তর্বর্তী সরকার এই বয়ান যুদ্ধ চালিয়ে গেছে গোটা সময়। মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ভাঙা থেকে শুরু করে, ৩২ এ আগুন, সাংস্কৃতিক সংগঠনে হামলা, গণমাধ্যমে আগুন- সব ক্ষেত্রেই প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় পেয়েছে মব। অন্তর্বর্তী সরকারের ভাষায় ‘পেশার গ্রুপ’। বয়ান যুদ্ধের ডামাডোলে চাপা পড়ে যাচ্ছে আসল কাজ—কাঠামোগত সংস্কার। একটি গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষের প্রথম দাবি থাকে বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ করা এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণসহ নাগরিক জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু সরকার যখন তার পুরো মনোযোগ ব্যয় করে মূর্তির ভাঙা বা জোড়া লাগানোতে, সংবিধানের দাড়ি-কমা বদলানোতে কিংবা ইতিহাসের বই থেকে নাম বাদ দেওয়াতে, তখন সাধারণ মানুষের কাছে রাষ্ট্রের ‘সার্ভিস ডেলিভারি’ গৌণ হয়ে পড়ে। পুলিশ আজও পুরোপুরি সক্রিয় হতে পারেনি, বাজার সিন্ডিকেট আগের মতোই শক্তিশালী, আর আমলাতন্ত্রে কেবল ব্যক্তির বদল ঘটেছে, ব্যবস্থার নয়। এই কাঠামোগত ব্যর্থতা যখন স্পষ্ট হয়, তখন সরকার তার ব্যর্থতা ঢাকতে আরো বেশি করে বয়ান বা আইডেন্টিটি পলিটিক্সের আশ্রয় নেয়। আর এখানেই শুরু হয় জনবিচ্ছিন্নতা।
সামাজিক-রাজনৈতিক সংস্কারের যে কথা বলা হয়েছিল, তা কেবল রাজপথের শক্তিমত্তার ওপর ভিত্তি করে সফল হওয়া সম্ভব নয়। একটি অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজন সহনশীলতা। কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, যে কোনো ভিন্নমতকে ‘ফ্যাসিবাদ’ বা ‘পুরানো ব্যবস্থার দোসর’ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই যে পলিটিক্যাল কারেক্টনেসের চাপ—যেখানে কথা বলতে গেলে ফ্যাক্টচেকারের ভয় লাগে—তা মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে নতুন করে শৃঙ্খলিত করছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের স্পিরিট ছিল বৈষম্যহীনতা, কিন্তু বয়ানের এই নতুন লড়াই সমাজে নতুন বিভাজন তৈরি করছে। এক পক্ষ মনে করছে তারা বিজয়ীর বেশে ইতিহাস নতুন করে লিখবে, আর বড় একটি অংশ মনে করছে তারা তাদের স্মৃতি ও পরিচয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
ড. ইউনূসের সরকারের অজনপ্রিয়তার কারণ কেবল প্রশাসনিক অদক্ষতা নয়, বরং ইতিহাসের অতি-ব্যবচ্ছেদ। মানুষ চায় একটি কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে তার ভোট নিশ্চিত হবে এবং পেটের ভাত জুটবে। কিন্তু সরকার যখন সেই মূল কাজগুলো রেখে ইতিহাসের প্রতিশোধ নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন রাষ্ট্র সংস্কারের সেই উচ্চাভিলাষী প্রজেক্ট মুখ থুবড়ে পড়ে। ইতিহাসকে অস্বীকার করা যেমন অপরাধ, ইতিহাসকে প্রতিশোধের হাতিয়ার বানানোও তেমনি বিপজ্জনক। এই সত্যটি যত দ্রুত সরকার উপলব্ধি করবে, ততই মঙ্গল।

