শবে বরাতে যা করবেন

মহান আল্লাহ তায়ালা নিজ বান্দাদের ওপর দয়া ও ক্ষমার কেবল অসিলা তালাশ করেন, যেকোনো পথেই হোক ক্ষমা করার বাহানা খোঁজেন। তাই দয়াময় আল্লাহ তায়ালা তাঁর গুনাহগার বান্দাদের ক্ষমা করার জন্য বিভিন্ন স্থান ও সময়-সুযোগ বাতলে দিয়েছেন, যাতে বান্দা নিজ কৃতকর্মে অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চায়, আর আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা করে দেবেন।
এ রাতের ব্যাপারে রাসুল (সা.) বলেছেন—
يطلع الله إلى خلقه في ليلة النصف من شعبان، فيغفر لجميع خلقه إلا لمشرك أو مشاحن.
আল্লাহ মধ্য শাবানের রাতে তার সৃষ্টিকুলের দিকে দয়ার দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন। (সহিহ ইবনে হিব্বান: ৫৬৬৫)
আমাদের বর্তমান সমাজে মানুষ পক্ষান্তরে বিরোধিতা করতে গিয়ে শবে বরাতের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে বসেছে এবং তারা এ রাতের কোনো বৈশিষ্ট্যই মানে না; বরং এ রাতের সব কিছুকেই বিদআত বলে থাকে। বাস্তবে এ দলটিও ভ্রষ্টতায় রয়েছে, কেননা শবে বরাতের একাধিক ফজিলত, তাৎপর্য ও বিভিন্ন করণীয় কোরআনুল কারিমে ও সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
হজরত মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, অর্ধ শাবানের রাতে অর্থাৎ শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতে আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টিকুলের প্রতি রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও হিংসুক-বিদ্বেষী লোক ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন। (সহিহ ইবনে হিব্বান, হা. ৫৬৬৫, আল মু’জামুল কাবীর ২০/১০৯, শুআবুল ইমান, হা. ৬৬২৮)।
এছাড়া হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, এক রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) উঠে নামাজে দাঁড়িয়ে গেলেন, এতে এত দীর্ঘ সময় ধরে সিজদা করলেন যে আমার ভয় হলো তিনি মারাই গেছেন কি না। এ চিন্তা করে আমি বিছানা থেকে উঠে রাসুল (সা.)-এর বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিই, এতে আমার বিশ্বাস হলো তিনি জীবিত আছেন। তারপর নিজ বিছানায় ফিরে এলাম। এরপর তিনি সিজদা থেকে মাথা ওঠালেন এবং নামাজ শেষ করে আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে আয়েশা! তোমার কি ধারণা হয়েছে যে নবী তোমার সঙ্গে সীমা লঙ্ঘন করেছে? আমি বলি, জি না, হে আল্লাহর রাসুল! তবে আপনার দীর্ঘ সময় ধরে সিজদার কারণে আমার মনে হয়েছে আপনি মৃত্যুবরণ করেছেন।
এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, হে আয়েশা! তুমি কি জানো, আজকের এ রাতটি কোন রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল এ বিষয়ে অধিক জ্ঞাত। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, এ রাতটি অর্ধ শাবানের রাত। এ রাতে আল্লাহ তায়ালা নিজ বান্দাদের প্রতি বিশেষ করুণার দৃষ্টি দেন, অনুগ্রহপ্রার্থীদের দয়া করেন। তবে হিংসুক লোকদের তার অবস্থার ওপর ছেড়ে দেন। (শুআবুল ইমান, হা. ৩৮৩৫)। যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ইমাম বায়হাকি (রহ.) বলেন, এটি উত্তম মুরসাল হাদিস। (শুআবুল ইমান ৩/৩৮৩)।
শবে বরাতে রাত জেগে ইবাদত করা ও পরদিন রোজা রাখা। হজরত আলী (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘১৪ শাবানের রাত যখন হয়, তোমরা রাতটি ইবাদত-বন্দেগিতে পালন করো এবং দিনের বেলা রোজা রাখো। কেননা এ রাতে সূর্যাস্তের পর আল্লাহ তায়ালা প্রথম আসমানে এসে বলেন, কোনো ক্ষমাপ্রার্থী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করে দেব।
ইসলামের আলোকে এই রাতের গুরুত্ব অনেক বেশি ।
শবে বরাতে প্রথম যে কাজটি করা উচিত, তা হলো নিজের গুনাহের জন্য খাঁটি মনে তওবা করা। আমরা সারা বছর জেনে বা না জেনে অসংখ্য ভুল করে থাকি। এই রাতে আল্লাহর দরবারে বিনীতভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করা, ভবিষ্যতে গুনাহ থেকে দূরে থাকার দৃঢ় অঙ্গীকার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নফল নামাজ
এই রাতে নফল নামাজ আদায় করা। তবে শবে বরাত উপলক্ষে কোনো নফল নামাজ বা নির্দিষ্ট কিছু রাকাত পড়া বাধ্যতামূলক নয়। দুই রাকাত করে যতটুকু সম্ভব নামাজ পড়া উত্তম। নামাজে কুরআন তিলাওয়াত, রুকু-সিজদায় দীর্ঘ দোয়া এবং খুশু-খুজুর সঙ্গে আল্লাহর সামনে নিজেকে সোপর্দ করার চেষ্টা করা উচিত।
কুরআন তিলাওয়াত
এছাড়াও কুরআন তিলাওয়াত করতে পারেন। কুরআন আল্লাহর কালাম। কুরআন তিলাওয়াত অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে এবং ইমানকে মজবুত করে। অন্তত কিছু আয়াত হলেও মনোযোগ সহকারে তিলাওয়াত করা এবং এর অর্থ অনুধাবনের চেষ্টা করা উত্তম।
দোয়া
এই রাতে দোয়ার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতে পারেন। নিজের জন্য, পরিবার-পরিজনের জন্য, মৃত আত্মীয়দের জন্য এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করতে পারেন। দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ, ইমানের দৃঢ়তা, হালাল রিজিক এবং সুন্দর পরিণতির জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা যেতে পারে।
কবর জিয়ারত
শবে বরাতে মৃতদের জন্য দোয়া করাও একটি উত্তম আমল। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) এই রাতে জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে গিয়ে মৃতদের জন্য দোয়া করেছেন। তাই ঘরে বসে হলেও পিতা-মাতা ও অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের রুহের মাগফিরাত কামনা করা যেতে পারে।
নফল রোজা
পরদিন অর্থাৎ শাবান মাসের ১৫ তারিখে নফল রোজা রাখা সুন্নত ও ফজিলতপূর্ণ আমল হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) শাবান মাসে অধিক পরিমাণে রোজা রাখতেন। এবং প্রতি আরবি মাসের ১৫ তারিখেও তিনি রোজা রাখতেন। শবে বরাতের পরদিন রোজা রাখা সেই সুন্নাহরই একটি অংশ।
যেসব কাজ থেকে বিরত থাকবেন
তবে শবে বরাতে কিছু বিষয় থেকে বিরত থাকা জরুরি। আতশবাজি, ফানুস ও অনর্থক আড্ডা এই রাতের পবিত্রতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তেমনি বিদআতপূর্ণ আমল বা ভিত্তিহীন রসম-রেওয়াজ থেকেও দূরে থাকা উচিত।
সব মিলিয়ে শবে বরাত হলো আত্মশুদ্ধি, আত্মসমালোচনা ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক মহাসুযোগ। এই রাতকে যদি আমরা ইবাদত ও দোয়ায় কাটাতে পারি, তবে তা আমাদের পরকালীন জীবনের জন্য পাথেয় হয়ে উঠতে পারে।

