ম্যান্ডেলসন বিতর্কে নতুন মোড়
স্টারমারকে সমর্থন করে ভুল স্বীকার সাবেক উপদেষ্টার

সংগৃহীত ছবি
যুক্তরাষ্ট্রে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত হিসেবে লেবার পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতা পিটার ম্যান্ডেলসনকে নিয়োগের সুপারিশ করার দায় নিজের কাঁধে নিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মর্গান ম্যাকসুইনি। তবে তিনি দাবি করেছেন, নিরাপত্তা যাচাই প্রক্রিয়া উপেক্ষা করতে কর্মকর্তাদের ওপর কোনো চাপ তিনি দেননি।
মঙ্গলবার হাউজ অব কমন্সের ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির সামনে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে ম্যাকসুইনি বললেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে এই নিয়োগের পক্ষে পরামর্শ দিয়েছিলাম এবং সেটি করা আমার ভুল ছিল।’
‘আমি জাতীয় নিরাপত্তা যাচাই তদারকি করিনি, কর্মকর্তাদের কোনো নিয়ম উপেক্ষা করতে বলিনি, কোনো ধাপ এড়িয়ে যেতে বলিনি কিংবা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এমন কোনো বার্তা দিইনি যে, যেকোনো মূল্যে ছাড়পত্র দিতে হবে।’
ম্যাকসুইনির এই বক্তব্য চলমান বিতর্কে স্টারমারের অবস্থান সমর্থন করে। বিশেষ করে, প্রধানমন্ত্রীকে ঝুঁকি সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছিল কি না— এই প্রশ্নে।
তিনি বললেন, স্টারমার তার পরামর্শের ওপর নির্ভর করেছিলেন এবং তিনি ‘ভুল করেছিলেন৷’
২০২৪ সালের শেষ দিকে ম্যান্ডেলসনকে রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেওয়া হয়। সে সময় স্টারমার তার ‘অতুলনীয় অভিজ্ঞতার’ প্রশংসা করেন।
ম্যাকসুইনি বলছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাবেক বাণিজ্য কমিশনার হিসেবে ম্যান্ডেলসনের অভিজ্ঞতা ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক সামলাতে যুক্তরাজ্যের কাজে আসবে বলে তিনি মনে করেছিলেন। কমলা হ্যারিস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে প্রধানমন্ত্রী সম্ভবত ম্যান্ডেলসনকে বেছে নিতেন না।
ম্যাকসুইনি জানিয়েছেন, শুরুতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে ম্যান্ডেলসনের সম্পর্ককে ‘স্বল্প পরিচয়’ হিসেবে দেখেছিলেন। পরে ই-মেইলে ঘনিষ্ঠতার প্রমাণ সামনে এলে তা তার কাছে হৃদয়ে ছুরি বসানোর মতো মনে হয়েছিল।
এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন তথ্য প্রকাশের পর গত সেপ্টেম্বরে ম্যান্ডেলসনকে বরখাস্ত করেন স্টারমার। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারে মারা যাওয়া দণ্ডিত যৌন অপরাধী এপস্টেইনের সঙ্গে ২০০৯ সালে সংবেদনশীল সরকারি তথ্য আদান-প্রদানের অভিযোগে ফেব্রুয়ারিতে ম্যান্ডেলসনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ গঠন হয়নি এবং তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। যৌন অসদাচরণের অভিযোগও তার বিরুদ্ধে নেই।
পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা ফিলিপ বার্টন কমিটিকে বলেছেন, ট্রাম্পের অভিষেক (২০ জানুয়ারি ২০২৫) সময়ের মধ্যে বা কাছাকাছি ম্যান্ডেলসনকে দায়িত্বে বসানোর জন্য তাড়াহুড়ার স্পষ্ট চাপ ছিল। তিনি বলেন, এটি ছিল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যেখানে তাকে পরামর্শের জন্য ডাকা হয়নি এবং স্টারমারের দপ্তর নিরাপত্তা যাচাই প্রক্রিয়ায় আগ্রহী ছিল না৷
বার্টন বলছিলেন, এপস্টেইনের সঙ্গে ম্যান্ডেলসনের সম্পর্ক সমস্যা তৈরি করতে পারে— এমন আশঙ্কা তার ছিল। তবে তিনি বলেন, আমার সামনে একটি সিদ্ধান্ত তুলে ধরা হয়েছিল এবং সেটি কার্যকর করতে বলা হয়েছিল।
এর আগে ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা অলি রবিনসও এমপিদের জানিয়েছিলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত করতে তার ওপর নিরবচ্ছিন্ন চাপ ছিল। যদিও স্টারমার দাবি করেছেন, তার দপ্তর থেকে কোনো ধরনের চাপ দেওয়া হয়নি।
নিরাপত্তা যাচাই প্রক্রিয়ায় যুক্ত কর্মকর্তা ইয়ান কলার্ড লিখিত সাক্ষ্যে বলেন, দ্রুত সিদ্ধান্ত দেওয়ার চাপ ছিল, তবে এতে তার সিদ্ধান্ত প্রভাবিত হয়নি।
এই বিতর্কে স্টারমারের পদত্যাগের দাবি তুলেছে বিরোধীরা। দিন যত যাচ্ছে, এই দাবি ততোই জোরালো হচ্ছে৷ তাদের অভিযোগ, ম্যান্ডেলসনের নিয়োগে পূর্ণ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে দাবি করে প্রধানমন্ত্রী সংসদকে বিভ্রান্ত করেছেন। কনজারভেটিভ নেত্রী কেমি ব্যাডেনক বলেন, স্টারমার বারবার হাউজ অব কমন্সকে বিভ্রান্ত করেছেন।
বিষয়টি প্রিভিলেজেস কমিটিতে পাঠানো হবে কি না, এ ব্যাপারে এমপিদের ভোট দেওয়ার কথা রয়েছে৷ এই কমিটি সংসদকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগ তদন্ত করতে পারে। এমন সিদ্ধান্ত তৈরি করতে পারে স্টারমারের ওপর পদত্যাগের তীব্র চাপ।
তবে স্টারমার লেবার এমপিদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে এই ভোটের বিরোধিতা করতে বলেছেন। তার ভাষায়, এটি আসন্ন ৭ মে ব্রিটেনের স্থানীয় নির্বাচনের আগে সরকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য একটি রাজনৈতিক কৌশল৷
ম্যান্ডেলসন বিতর্কে লেবার পার্টির ভেতরেও অস্বস্তি বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি এমন এক সময় সামনে এসেছে, যখন আসন্ন নির্বাচনে দলটির কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।




