ইরানের গানের স্কুল এখন ধ্বংসস্তূপ

ইরানের রাজধানী তেহরানে ধ্বংস হয়ে যাওয়া মিউজিক স্টুডিওর ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন হামিদরেজা আফারিদেহ।
পটু হাতে সেতারের তারে তোলা দক্ষ সুর অথবা সান্তুরের টুংটাং, একসময় ক্লাসিকাল পার্সিয়ান সুরে ভরে থাকত যে গানের ক্লাস, আজ তা কেবলই ভগ্নস্তূপ। বলা হচ্ছে ইরানের হোনিয়াক মিউজিক একাডেমির কথা।
এটি ছিল ইরানি সংগীতশিল্পী হামিদরেজা আফারিদেহের গর্ব ও আনন্দের কেন্দ্র। দুই বছর আগে তিনি আর তার স্ত্রী সাঈদা এবাদাতদুস্ত মিলে প্রতিষ্ঠা করেন এই স্কুলটি।
নিজের হৃদয় নিংড়ানো সবটুকু আবেগ আর অর্থ ঢেলে এই গানের স্কুলটি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন তারা।
হোনিয়াক মিউজিক একাডেমি ছিল ২৫০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়ের মতো। শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত বিভিন্ন বয়সের মানুষ সেখানে ক্লাসিকাল গান শিখত।
হামিদের ভাষায়, আমাদেরে সবকিছুই এখন সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
গত ২৩ মার্চ একটি ইসরায়েলি বিমান তেহরানের এই এলাকা লক্ষ্য করে হামলা করে। তখন এই গানের স্কুলটি যে ভবনে ছিল, সেই ভবনটিতে এসে আঘাত লাগে। একই ভবনে একটি প্রসূতি ক্লিনিকসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও ছিল।
গানের স্কুলের এই ভবনটি তেহরানের পূর্ব পাশে অবস্থিত একটি সামরিক বিমানঘাঁটি থেকে দুই কিলোমিটারের দূরত্বে অবস্থিত ছিল।
সৌভাগ্যবশত হামলার সময় গানের স্কুলটিতে কেউ উপস্থিত ছিল না।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরু হওয়ার কিছুদিন পরই আফারিদেহ ও এবাদাতদুস্ত তাদের শিক্ষার্থী ও কর্মীদের নিরাপত্তার জন্য বন্ধ করে দিয়েছিলেন স্কুলটি।
মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া গেলেও এই ঘটনাটি গানের শিক্ষক দম্পতির জন্য বিশাল ক্ষতির ব্যাপার। এ ক্ষতি কেবল আর্থিক নয়, এ ক্ষতি গভীরভাবে আঘাত করেছে তাদের মনেও।
শুরু থেকেই শিল্পানুরাগী এই দম্পতি তাদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন সংগীতের আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য। গানের স্কুলটি ধ্বংস হওয়া আর কিছু নয়, এই ঘটনা যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাবের এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি যেন!
যুদ্ধ যে শুধু মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ায় তা নয়, যুদ্ধে হারিয়ে যায় স্বাভাবিক জীবনের গতি, মানসিক নিরাপত্তা। মানুষের জীবিকা ও তিলে তিলে বুনে চলা স্বপ্ন।
আফারিদেহ জানান, আমার স্ত্রী আর আমি ১৫ বছরের কঠোর পরিশ্রমে যে গানের স্কুলটি একটু একটু করে লালন করে গড়ে তুলেছিলাম, তার সবকিছু এক রাতে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে গেছে। আমার স্বপ্নের ঠিকানাটি পুরোপুরি মুছে গেছে। কিছুই অবশিষ্ট নেই আর।
বিমান হামলার দিন
সেদিন ভোরের কিছুক্ষণ পরই প্রথম বিপদের ইঙ্গিত আসে। হঠাৎ করেই সংগীত স্কুলের অ্যালার্ম সিস্টেম বেজে ওঠে।
অ্যালার্ম শুনে আফারিদেহ ও তার স্ত্রী ভেবেছিলেন, হয়তো কেউ চুরি করতে ঢুকেছে। তারা তাৎক্ষণিক সেখানে ছুটে যান। কিন্তু কাছে পৌঁছেই বুঝতে পারেন, ঘটনা আরও ভয়াবহ।
আফারিদেহের ভাষ্য, আমরা তখন আকাশে ঘন ধোঁয়া আর কুয়াশা দেখতে পেলাম। এতটাই ঘন যে সামনে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না, ঠিকমতো গাড়িও চালানো যাচ্ছিল না।
তারা বহু ঘণ্টা বাইরে অপেক্ষা করতে থাকেন। পরে ইরানি কর্তৃপক্ষ যখন উদ্ধার কাজ শেষ করে তাদের ভেতরে ঢোকার অনুমতি দেয়, তখনই ভেতরে যান তারা।
স্কুলটি ছিল ভবনের চতুর্থ তলায়।
‘আমরা যত ওপরে উঠছিলাম, ধ্বংসের দৃশ্য ততই যেন ভয়াবহ হচ্ছিল। সিঁড়িগুলো পর্যন্ত ভেঙে পড়ছিল আমাদের ওঠার সময়’, আফারিদেহ আরও জানিয়েছেন।
অবশেষে তারা নিজেদের ইউনিটে পৌঁছে দেখেন সবকিছু ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। হামলায় স্কুলের জানালাগুলো উড়ে গেছে, বাইরের দেয়াল ধসে পড়েছে।
আফারিদেহ বলেছেন, একটাও বাদ্যযন্ত্র অবশিষ্ট ছিল না আমাদের। তাছাড়া টিভি, অডিও সিস্টেম, একটি গানের স্কুলে যা কিছু থাকা উচিত, কিছুই আর নেই। এমনকি বিশেষ সাউন্ডপ্রুফ দেয়ালগুলোও পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।
‘ধ্বংসস্তূপে ভাঙা বাদ্যযন্ত্রগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল কেবল। মনে হচ্ছে যা কিছু ভগ্নস্তূপে পরিণত হয়েছে আজ কখনো এসব কিছুর অস্তিত্ব ছিলই না আগে।’
সেই দিন তেহরান জুড়ে বিমান হামলা চলছিল, যেমনটি চলছিল টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে।সন্ধ্যায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তারা জানায়, তারা তেহরানে সেখানেই হামলা চালিয়েছিল, যেখানে সরকারি ও সামরিক ভবনগুলো আছে।কিন্তু শুধু সেগুলোই নয়, শহরের উত্তরে একটি আবাসিক ভবনেও হামলা হয় সেদিন। সেই ভবনে এক শিশু সেদিন আটকা পড়ে যায় এবং কয়েক ঘণ্টা পর তাকে উদ্ধার করা হয়।তাদের কাছে জানতে চাইলে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী জানায় যে, তারা উল্লেখিত স্থানের কাছাকাছি কুদস ফোর্সের একটি গোয়েন্দা সদর দপ্তর লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছিল।তারা আরও দাবি করে যে, এই হামলা আন্তর্জাতিক আইন মেনেই করা হয়েছে এবং তাদের প্রত্যাশিত সামরিক সুবিধা আশপাশের ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়েছিল।এখন আফারিদেহ ও এবাদাতদুস্ত ভাবছেন কীভাবে আবার শুরু থেকে শুরু করা যায়। কোথা থেকে অর্থ জোগাড় করা যায় আবার। তারা এও ভাবছেন, কীভাবে তাদের কর্মী ও শিক্ষার্থীদের সহায়তা করবেন এই যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে।আফারিদেহের মতে, অনেক শিক্ষার্থীর জন্য এটি ছিল তাদের দ্বিতীয় বাড়ির মতো। এখানে তারা নিরাপত্তা ও স্বস্তি পেত। আমরা স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে কাজ করতাম বলে পরিবেশটা ছিল পারিবারিক আবহে তৈরি।এখন সেই জায়গাটি আর নেই। এতে কেবল স্কুলের স্বত্ত্বাধিকারী দম্পতিই নন, ভেঙে পড়েছেন শিক্ষার্থীরাও। এই স্কুলে প্রায় দুই ডজন শিক্ষক ও কর্মচারী কাজ করতেন। তাদের অনেকেই তরুণ। দেশটির অর্থনীতি যখন যুদ্ধের কারণে বিপর্যস্ত, সে সময়ে এখন সেই তরুণরাও সবাই বেকার হয়ে পড়েছেন। ভবনটি এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত যে নতুন জায়গায় স্কুল সরাতে হবে। কিন্তু নতুন করে শুরু করার মতো আর্থিক ও মানসিক অবস্থা তাদের আছে কি না, তা ভাবনার বিষয়। বিশেষ করে যখন মূল্যস্ফীতি দ্রুত বাড়ছে।তাদের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৪২ হাজার ডলারের সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এখন তারা ইরানের বিভিন্ন সংগীত সংগঠন এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কাছে সহায়তা চাইছেন।
কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় সহায়তা পেতে সময় লাগতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা চললেও উভয় পক্ষের বক্তব্যে অস্পষ্টতা রয়েছে। এদিকে, নেতারা নিজেদের মতো করে যথারীতি হুমকি ও হামলা চালিয়েই যাচ্ছেন। যার মূল্য দিচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষ।
গানের স্কুলটির স্বত্ত্বাধিকারী আফারিদেহর চাওয়া, ইরান হাজার বছরের সংস্কৃতি ও শিল্পসমৃদ্ধ দেশ হিসেবে বেঁচে আছে। সংগীত আমাদের পরিচয়ের একটি অংশ। এই পরিচয় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে, এটাকে অবশ্যই আমাদের রক্ষা ও সমর্থন করে যেতে হবে।














