গণভোটসহ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিল ইস্যুতে হার্ডলাইনে জামায়াত-এনসিপি
- টানা মাঠের কর্মসূচির চিন্তা
- পরবর্তী অধিবেশনেও এই ইস্যুতে উত্তপ্ত থাকবে সংসদ
- দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে বলছেন বিশেষজ্ঞরা

সংগৃহীত ছবি
সরকারের পক্ষ থেকে গণভোট, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিলের প্রস্তাব ঘিরে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। বিষয়টিকে কেন্দ্র করে হার্ডলাইনে অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) জাতীয় সংসদের বিরোধী দল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ইস্যু বড় আকার ধারণ করলে দেশে ফের তৈরি হতে পারে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা।
বিরোধী দলের নেতারা বলেছেন, এসব অধ্যাদেশ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত সংস্কারের সঙ্গে সম্পর্কিত। সেগুলো বাতিলের উদ্যোগকে তারা আখ্যা দিচ্ছেন ‘জনস্বার্থবিরোধী’ হিসেবে। ইতোমধ্যে তারা বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন রাজনৈতিকভাবে এবং চিন্তাভাবনা করছেন টানা মাঠের কর্মসূচিতে যাওয়ার।
চলমান অধিবেশনের শুরু থেকেই গণভোট বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবিতে উত্তপ্ত ছিল সংসদ। বিশেষ করে, সর্বশেষ তিন দিন এটি বিয়ে বিতর্ক হয় ব্যাপক। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বারংবার দাবি জানালেও নিজেদের অবস্থানে অটুট থাকে সরকারি দল। এরইমধ্যে গণভোটসহ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো বাতিলের প্রস্তাবে যেন তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছে বিরোধী দলগুলো।
এরইমধ্যে গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সংসদে ‘আশানুরূপ সাড়া’ না পেয়ে মাঠের কর্মসূচিতে যাওয়ার পরিকল্পনাও হচ্ছিল। গত বুধবার জাতীয় সংসদের অধিবেশন থেকে ওয়াকআউটের পর এ ইঙ্গিত দিয়েছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। পরে বৃহস্পতিবার আন্দোলনের বিষয় নিয়ে রাজধানীর গুলশানে বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরের বাসায় দুই ঘণ্টার বৈঠক করেছেন জোটের শীর্ষ নেতারা। বৈঠকে দলগুলোর শীর্ষ নেতারা উপস্থিত হয়ে মতামত দেন। গণভোটের রায় বাস্তবায়নে আন্দোলনে যাওয়ার বিষয়ে বৈঠকে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়। তারই অংশ হিসেবে শনিবার (৪ এপ্রিল) জুলাই সনদ কার্যকর এবং গণভোটের ফল অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে ১১ দলীয় জোট। আগামী মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) শীর্ষ নেতাদের পরবর্তী বৈঠক থেকে দীর্ঘমেয়াদী কঠোর আন্দোলনের রূপরেখা ঘোষণা করা হবে বলেও জানা গেছে দলীয় সূত্রে ।
জোটের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জুলাই সনদ কার্যকর ও গণভোট অধ্যাদেশসহ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিলের প্রতিবাদে পালন করা হবে টানা কর্মসূচি। রাজপথের কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে করা হবে বাধ্য। এছাড়া আগামীকাল থেকে শুরু হওয়া অধিবেশনেও বিষয়গুলো নিয়ে সরব অবস্থানে থাকবে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। সরকার যদি নিজেদের অবস্থানে অটুট থাকে তাহলে ফের সংসদ ওয়াকআউট ও বর্জনের সিদ্ধান্তও আসতে পারে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়ে অনেকটা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতোই হাঁটছে ফ্যাসিবাদী পথে। তিনি বলেছেন, ‘সরকার সংসদ পরিচালনায় পরিচয় দিয়েছে ব্যর্থতার। জনস্বার্থ রক্ষায় এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নে রাজপথের আন্দোলন ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই।’
রাজপথে প্রতিহত করার ঘোষণা নেতাদের
শনিবার (৪ এপ্রিল) গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে সরকারি দলের অবস্থানের প্রতিবাদে রাজধানীতে বিক্ষোভ করেছে ১১ দলীয় ঐক্য। বিক্ষোভে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে নেতা কর্মীদের খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে যোগ দিতে দেখা যায়। এ সময় তারা গণভোটের পক্ষে দিতে থাকেন বিভিন্ন স্লোগান। তাদের হাতে দেখা যায় ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন চাই’; ‘গণভোট মানতে হবে’ প্রভৃতি লেখা সম্বলিত প্ল্যাকার্ড। ১১ দলীয় ঐক্য ঢাকা মহানগরীর উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম। এ সময় জোটের নেতারা দাবি আদায় না হলে রাজপথে প্রতিহত করার ঘোষণা দেন।
বাংলাদেশ জামায়াতের ইসলামীর নায়েবে আমির ও সংসদ সদস্য এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেছেন, জুলাই বিপ্লব ছিল পুরাতন ব্যবস্থাকে ছুঁড়ে ফেলে নতুন ব্যবস্থা কায়েম করা। জুলাই বিপ্লব ছিল, একদল ব্যক্তির হাতে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত না করে জনগণের ক্ষমতাকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া। আজকে গণভোটকে অস্বীকার করা মানে শুধু ৭০ ভাগ মানুষের রায়কে অস্বীকার করা নয়, ৭০ ভাগ মানুষের রায়কে অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে আবার তারা সেই ফ্যাসিবাদী কায়দায় এক ব্যক্তির কাছে দিতে চায় সমস্ত ক্ষমতা।
তিনি বলেছেন, আমাদের বাধ্য করবেন না রাজপথে আসতে। সময় থাকতে যদি দেশকে ভালোভাবে চালাতে চান তাহলে মেনে নেন গণভোটের রায়। জনগণ আপনাদের শ্রদ্ধা করবে, ভালোবাসবে। আর যদি অবজ্ঞা করেন সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার কারণে তবে ভালো হবে না পরিণতি।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক বলেছেন, বিএনপির হয়েছে সুবিধাবাদের রোগ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যে অধ্যাদেশগুলো ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করে সেগুলো বিএনপির কাছে খুব পছন্দনীয় আর যে অধ্যাদেশগুলো জনগণের জন্য ভালো সেগুলো তাদের কাছে অপছন্দনীয়। বিএনপি সারা দেশে না এর পক্ষে ভোট চেয়েছে আর প্রকাশ্যে হ্যাঁ এর পক্ষে ভোট চেয়েছে বাধ্য হয়ে। বাংলাদেশের মানুষ পছন্দ করে না মুনাফিকের রাজনীতি। এ দেশের জনরায়কে যদি হাইকোর্ট দেখান, এ দেশের জনগণ রাজপথে আপনাদের মোকাবিলা করবে। জনগণের রায়ের প্রতি সন্মান রাখেন। তা না হলে সংসদে এবং রাজপথে আমরা আপনাদের প্রতিহত করব, ইনশাআল্লাহ।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেনের ভাষ্য, জনগণ গণভোটের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামোতে যে পরিবর্তন চেয়েছে, আজকে সেটাকে তারা পায়তারা করছে অমান্য করার। তারা সংবিধানের কথা বলছে, আমরা বলি দেশ পরিচালনা করতে সংবিধান লাগবে কিন্তু সেই সংবিধান ৭২ এর মুজিববাদী সংবিধান না, শেখ হাসিনার সংবিধান না, কোনো দল বা বিএনপির সংবিধান না।
তিনি আরও বলেছেন, আমরা তো বুঝি, আপনারা সংস্কার চান না, গণভোট চান না তার পেছনে কারণ হলো আপনারা বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতাকে, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এক ব্যক্তির করায়ত্ব করে রাখতে চান। গণভোট মেনে নিলে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ হবে স্বচ্ছ্, আপনাদের কর্তৃত্ব থাকবে না এককভাবে। সে কারণে আপনারা গণভোট মেনে নিতে চান না। গণভোট মেনে নিলে তত্বাবধায়ক সরকারের অন্তর্ভূক্তিমুলক কাঠামো আসবে আপনারা সেটা চান না। গণভোট কার্যকর হলে উচ্চকক্ষ হবে ভোটের পিআর অনুযায়ী আপনারা সেটা চান না। আপনারা মৌলিক কাঠামোর পরিবর্তন চান না। এ কারণেই গণভোট চান না। আমরা বলতে চাই, সংসদে আপনাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ ৭০ শতাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাজপথে আছে। এই জনগণকে কোনোভাবেই অমান্য করে আপনারা টিকে থাকতে পারবেন না। আপনাদের পতন নয়, আপনাদের সুন্দর পদক্ষেপের অপেক্ষায়। জাতিকে সাথে নিয়ে আমরা অপেক্ষা করছি। সংসদে রাজপথে কথা হবে সংস্কারের জন্য।
অধ্যাদেশ বাতিলে ডাকসুর প্রতিবাদ
এদিকে সরকার কর্তৃক গণভোট, গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিলের প্রস্তাবে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। এক বিবৃতিতে ডাকসু বলেছে, জুলাই বিপ্লবের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্যই এসব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের সুস্পষ্ট বিজয়ের মাধ্যমে জনগণও সংস্কারের পক্ষে তাদের অবস্থান জানিয়েছে পরিষ্কারভাবে।
সংগঠনটির মতে, ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আসা এসব অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ জনগণের রায়ের প্রতি সরাসরি অবজ্ঞা প্রদর্শন এবং জুলাই বিপ্লবের আত্মত্যাগকে অস্বীকার করার নামান্তর।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ডাকসু বলেছে, জনরায় ও জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে, দ্বিচারিতা পরিহার করতে হবে এবং রাষ্ট্র সংস্কারের জনআকাঙ্ক্ষার পথে ফিরে আসতে হবে। অন্যথায় জনসাধারণের ম্যান্ডেট উপেক্ষা করে যদি ফ্যাসিবাদী কাঠামো পুনর্বহালের দুঃসাহস দেখানো হয়, তবে তার পরিণতির দায়ও সরকারকেই নিতে হবে। সংগঠনটি স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, এদেশের ইতিহাস সাক্ষী— জনগণের রায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে কোনো শাসকই বেশিদিন টিকে থাকতে পারেনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ইস্যুতে কেবল রাজপথ নয়, সংসদেও বাড়তে পারে উত্তেজনা। আসন্ন অধিবেশনগুলোতে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র বিতর্ক এবং আশঙ্কা করা হচ্ছে বাকবিতণ্ডার। একইসঙ্গে দেশে বড় ধরনের কোনো সংঘাত কিংবা তৈরি হতে পারে বিশৃঙ্খলা।
রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান বলেছেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যাদেশগুলো হঠাৎ করে বাতিলের উদ্যোগ নিলে সেটি রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে যখন বিরোধী দলগুলো এটিকে জনস্বার্থের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরে মাঠে নামবে, তখন পরিস্থিতি হতে পারে আরও জটিল।’
‘এই ইস্যুতে যদি সমঝোতার পথ খোঁজা না হয়, তাহলে রাজপথ ও সংসদ— দুই জায়গাতেই উত্তেজনা বাড়বে। এমনকি দীর্ঘমেয়াদে এটি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার দিকেও ঠেলে দিতে পারে’— যোগ করেন তিনি।

