নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের প্রথম বাজেট
উন্নয়ন বরাদ্দে উচ্চাভিলাষ
- আগামী অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ কোটি টাকার এডিপি
- অর্থের জোগাড় হবে সরকারি তহবিল থেকে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি
- বৈদেশিক ঋণ থেকে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা
- পাঁচ খাতেই সর্বোচ্চ বরাদ্দ ৬২ দশমিক ১০ শতাংশ
- সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাচ্ছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাত
- শিক্ষায় ৪৭ হাজার ৫৯১ কোটি, স্বাস্থ্যে ৩৫ হাজার ৫৩৫ কোটি

আসছে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের প্রথম বাজেট। এর অংশ হিসেবে উন্নয়ন কর্মসূচিতে দেওয়া হচ্ছে উচ্চাভিলাষী বরাদ্দ। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ৩ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে দেওয়া হবে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি বা ৬৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ এবং বৈদেশিক ঋণ থেকে সংগ্রহ করা হবে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা বা ৩৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরের মূল এডিপি ছিল ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকার। সে তুলনায় বেড়েছে ৬১ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা। অর্থবছরের মাঝপথে এসে কাটছাঁট করে কমিয়ে সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ দেওয়া হয় ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা। এ হিসাবে আগামী অর্থবছর বরাদ্দ বাড়বে ৯১ হাজার ৬৫ কোটি টাকা। কিন্তু এডিপি বাস্তবায়নে বিরাজ করছে উল্টো চিত্র। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে এমন বরাদ্দ উচ্চাভিলাষী ছাড়া কিছুই নয়।
আগামী ৯ মে নতুন এডিপি উঠতে যাচ্ছে পরিকল্পনা কমিশনের বর্ধিত সভায়। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সন্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠেয় সভায় সভাপতিত্ব করবেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এরপরই এটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য যত দ্রুত সম্ভব উপস্থাপন করা হবে জাতীয় অর্থনেতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে। সেখানে সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী ও এনইসি চেয়ারপারসন তারেক রহমান। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
এ প্রসঙ্গে বুধবার বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন আগামীর সময়কে বলছিলেন, এত বড় এডিপি অবশ্যই উচ্চাভিলাষী। কেননা এটির জন্য একদিকে অর্থের সমস্যা আছে, অন্যদিকে আছে বাস্তবায়নে সক্ষমতার অভাব। যেমন বৈদেশিক ঋণ বরাদ্দের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, সে নিট বৈদেশিক ঋণ পাওয়া সহজ হবে না। পাশাপাশি সরকারি তহবিলের যে বরাদ্দ ধরা হচ্ছে, সেটি যদি স্থানীয় বাজার থেকে সরকার ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রাপ্তি বাধাগ্রস্ত হবে। এখানে অর্থ ও ক্যাপাসিটি দুদিক থেকেই সমস্যা দেখা যাচ্ছে। যদি দেখা যায়, অর্থ আছে বাস্তবায়নের ক্যাপাসিটি নেই, তাহলেও তো কোনো লাভ হবে না। আবার অর্থ নেই, ক্যাপাসিটি আছে তাতেও কিছু হয় না।
এ অর্থনীতিবিদের আরও মত, ‘দেশে যেখানে প্রবৃদ্ধি দুর্বল এবং মূল্যস্ফীতি অনেক বেশি, সেখানে এত বড় এডিপি আরও সমস্যা তৈরি করবে। কেননা আমাদের বর্তমান সমস্যা সাপ্লাই সাইডে। জোগান নেই। ফলে সরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে চাহিদা বাড়ালে কোনো লাভ হবে না।
‘দেশে গ্যাস নেই, ডিজেল সংকট, সার আমদানিতে সমস্যা রয়েছে। এত সব কাঠামোগত সমস্যার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সেখানে কাঠামোগত সমস্যা সমাধান না করে চাহিদা বাড়ালে মূল্যস্ফীতিকেই উসকে দেবে। ফলে সমস্যাকে আরও কঠিন করে তুলবে।’
পরিকল্পনা কমিশনের দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা জানালেন, আগামী অর্থবছর এডিপির আওতায় সর্বোচ্চ পেতে যাওয়া পাঁচটি খাত হলো পরিবহন ও যোগাযোগ ৫০ হাজার ৯২ কোটি টাকা, শিক্ষায় ৪৭ হাজার ৫৯১ কোটি, স্বাস্থ্যে ৩৫ হাজার ৫৩৫ কোটি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৩২ হাজার ৬৯১ কোটি এবং গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধাবলি খাতে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ২০ হাজার ৩৬১ কোটি ৭২ লাখ টাকা। এই পাঁচ খাতেই মোট বরাদ্দ যাচ্ছে ১ লাখ ৮৬ হাজার ২৭২ কোটি টাকা, যা মোট প্রস্তাবিত এডিপির ৬২ দশমিক ১০ শতাংশ।
সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেতে যাওয়া ১০ মন্ত্রণালয় ও বিভাগ
স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতায় দেওয়া হবে ৩৩ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে ৩০ হাজার ৭৪১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে ২৬ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে ২০ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হচ্ছে ১৯ হাজার ৪৪০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।
এ ছাড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে ১৭ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা, বিদ্যুৎ বিভাগে ১৪ হাজার ৯৩৮ কোটি, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে ৮ হাজার ২২০ কোটি, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে ৮ হাজার ৬ কোটি এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতায় ৭ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা।
সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন-আল-রশীদ বলছিলেন, ‘আমাদের মূল সমস্যা হলো সক্ষমতার অভাব। এদিকে কেন জানি নজর দেওয়া হয় না। যদি এডিপি বাস্তবায়নের দক্ষতা ও সক্ষমতা থাকত, তাহলে এ বরাদ্দে খুব বেশি সমস্যা হতো না।’
তার মতে ৩ লাখ কোটি টাকার এডিপি বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থের জোগাড় করা। এক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের যেমন চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে, তেমনি বৈদেশিক ঋণ পাওয়া কঠিন হবে।



