আতঙ্ক ছড়াচ্ছে হান্টাভাইরাস, প্রতিকার কী

সংগৃহীত ছবি
আটলান্টিক মহাসাগরে ‘এমভি হন্ডিউস’ নামের একটি ক্রুজ শিপে ছড়িয়ে পড়েছে হান্টাভাইরাস। বিশ্বজুড়ে এ নিয়ে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস মাইক্রো ব্লগিং সাইট এক্স-এ বলেছেন, উদ্ধার হওয়া ওই তিন ব্যক্তিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য নেদারল্যান্ডসে পাঠানো হয়েছে। রোগটিতে এখন পর্যন্ত তিনজন মারা গেছেন এবং পর্যবেক্ষণে আছেন আরও তিনজন। জাহাজটি ১ এপ্রিল আর্জেন্টিনার উশুয়াইয়া থেকে যাত্রা শুরু করে দক্ষিণ আটলান্টিক হয়ে অ্যান্টার্কটিকা ও বিভিন্ন দ্বীপে বিরতি নেয়।
১৯৯৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথমবারের মতো দেখা দেয় হান্টাভাইরাস। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে অস্কারজয়ী অভিনেতা জিন হ্যাকম্যানের স্ত্রী বেটসি আরাকাওয়া এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তার বাড়ির বাইরেই একটি ইঁদুরের বাসা পাওয়া যায়।
এশিয়া ও ইউরোপে হান্টা ভাইরাসের সংক্রমণের হার দেখা যাচ্ছে সবচেয়ে বেশি। প্রতিবছর সারাবিশ্বে প্রায় ১০ হাজার থেকে ১ লাখ মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হন। রোগটি মারাত্মক প্রাণঘাতী।
কীভাবে ছড়ায়
এটি একটি সংক্রামক ও পানিবাহিত রোগ। আক্রান্ত ইঁদুরের শরীর থেকে বের হওয়া তরল থেকে ছড়ায় এটি। ইঁদুরের শুকনো মল, মূত্র বা লালার ক্ষুদ্র কণা বাতাসে ছড়ালে যখন তা নিঃশ্বাসের মাধ্যমে মানুষের দেহে প্রবেশ করে তখন সংক্রমণ ঘটে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইঁদুরের কামড় বা আঁচড় থেকেও রোগটি সংক্রমিত হয়।
ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটির বিশেষজ্ঞ অ্যাডাম টেইলর বলছেন, এই প্রাদুর্ভাব নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। হান্টাভাইরাস সাধারণত প্রাণীর বর্জ্যের সংস্পর্শে ছড়ায়।
দক্ষিণ আফ্রিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর কমিউনিকেবল ডিজিজেসের তথ্যমতে, এমভি হন্ডিউস জাহাজ থেকে নামা দুই ব্যক্তির দেহে আন্দেস ভাইরাসের উপস্থিতি ছিল।
লন্ডন স্কুল অফ হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের বিশেষজ্ঞ রজার হিউসনের ভাষ্য, আক্রান্ত ব্যক্তি ইঁদুরের উপদ্রব রয়েছে এমন কোনো পরিবেশ, গুদাম, জাহাজের কেবিন বা বদ্ধ জায়গার সংস্পর্শে এসেছিলেন কি না, সেটিই তদন্তের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ভাইরাসের ধরণ ও লক্ষণ
প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত জ্বর, পেশিতে ব্যথা ও প্রচণ্ড মাথাব্যথার মতো লক্ষণ দেখা দেয়। তবে হান্টাভাইরাস মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধি, যা সঠিক সময়ে শনাক্ত না হলে দেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল করে দিতে পারে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন নিউ সায়েন্টিস্টের মতে, ভৌগোলিক অবস্থানভেদে হান্টাভাইরাসের সংক্রমণ ও লক্ষণে ভিন্নতা দেখা যায়। হান্টাভাইরাসের জন্য দুই ধরনের রোগের জন্ম হয়। প্রথমটি ফুসফুসে ও দ্বিতীয়টি কিডনিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ইউরোপ ও এশিয়ায় পাওয়া হান্টাভাইরাসে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কিডনির ক্ষতি হয়। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় পাওয়া ভাইরাসে দেখা দেয় পালমোনারি সিনড্রোম, যা ফুসফুসের ক্ষতি করে। শুরুতে জ্বরের মত আসে। সাথে ক্লান্তি, জ্বর, কাঁপুনি ও ব্যথ্যা শুরু হয়। সময়ের সাথে সাথে ফুসফুসে তরল জমে যায়, যা শ্বাসকষ্ট এবং বুকে চাপ সৃষ্টি করে। এতে তীব্র শ্বাসকষ্ট, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিকল হওয়া এবং এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।
সংক্রমণে উপসর্গ পেতে এক থেকে আট সপ্তাহ সময় লাগে। সিডিসির মতে, কারো শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে এইচপিএসে মৃত্যুর সম্ভাবনা থাকে প্রায় ৪০ শতাংশ।
ডাব্লিউএইচও সোমবার বলেছে, আতঙ্কের কারণ নেই। সাধারণ মানুষের জন্য ঝুঁকি কমই। এখনো অবশ্য সাগরে এ রোগের বিস্তার নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সন্দেহ রয়েছে। মৃত্যুহার যথাক্রমে হান্টাভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোমে প্রায় ৩৮%, ও হেমোরেজিক ফিভার উইথ রেনাল সিনড্রোমে ১–১৫% ।
প্রতিকার
হান্টাভাইরাস প্রতিকারে এখনও কোনো ভ্যাকসিন নেই। প্রতিকারে প্রচলিত কিছু পদ্ধতির শরণাপন্ন হতে হয়। যেমন, রোগীকে অক্সিজেন দেওয়া, কৃত্তিম উপায়ে শ্বাস-প্রশ্বাস চালিয়ে যাওয়া, প্রয়োজনে ডায়ালাইসিস এবং গুরুতর ক্ষেত্রে আইসিইউতে নিবিড় পরিচর্যা।
বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর প্রায় দেড় লাখ মানুষ হেমোরেজিক ফিভার উইথ রিনাল সিনড্রোমে আক্রান্ত হন, যার অর্ধেকেরও বেশি চীনে। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯৩ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত ৮৯০টি কেস নথিভুক্ত হয়েছে। এছাড়াও সিউল ভাইরাস নামের একটি স্ট্রেইন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে। রোগটি শনাক্ত করার জন্য পিসিআর টেস্ট করা হয়। গুরুতর ক্ষেত্রে এক্সট্রা কর্পোরিয়াল মেম্ব্রেইন অক্সিজেনেশন ব্যবহার করে চালু রাখা হয় রক্তে অক্সিজেন সরবরাহ।
হান্টাভাইরাস একটি প্রাণঘাতী ভাইরাস, যার কোনো ভ্যাকসিন নেই। এখানে সবচেয়ে বড় প্রতিকার ঘরবাড়ি ও কর্মক্ষেত্রে ইঁদুরের উপদ্রব নিয়ন্ত্রণ, খাবার ও আবর্জনা সঠিকভাবে সংরক্ষণ, ইঁদুর ঢোকার পথ বন্ধ করা ও ফাঁদ ব্যবহার এবং পরিষ্কারের সময় মাস্ক ও সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম ব্যবহার করা। তাই ইঁদুরের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিলেই বাঁচতে পারে জীবন।




