দৃষ্টিপাত
মাঝখানের মানুষটির চিৎকার কেউ শোনে না

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
গরিবের কষ্ট নিয়ে নাটক হয়, সিনেমা হয়, হয় রাস্তায় মিছিল। ধনীর বিলাসিতার খবর ছড়ায় ম্যাগাজিনের পাতায়, সামাজিক মাধ্যমে। কিন্তু মাঝখানের সেই মানুষটির কথা? যার ব্যাংক ব্যালেন্স না খুব কম, না খুব বেশি। যে দিনশেষে হিসেব মেলাতে গেলে বুঝতে পারে, মাস শেষ হলো না, বেতনও শেষ। সেই মানুষটির সংকট যেন অদৃশ্য, তার আর্তি ধরা পড়ে না ক্যামেরায়, পড়ে না নেতার বক্তৃতায়।
এই মধ্যবিত্তের জীবনের বাস্তবতা কঠিন। ভাতের সংস্থান আছে, কিন্তু বাজার করতে গেলে কাঁপে হাত। সন্তান ভালো স্কুলে পড়ে, কিন্তু ফি দেওয়ার দিন স্বপ্নের বদলে চাপা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। চিকিৎসার খরচ বেড়ে গেলে ‘নগদ’ বলতে কিছু থাকে না বললেই চলে। বড় রোগ হলে ভাবতে হয়- ব্যাংকের জমানো টা ভাঙব, নাকি প্রতিবেশীর কাছে হাত পাতব? দুটোই যেন অপমানের।
এই মানুষগুলো চায় না কেউ তাদের জন্য দাতব্য চালু করুক। চায় না বিনামূল্যে রেশন। তারা চায় শুধু একটু সুস্থিতি। দাম যেন না বেড়ে যায় বিনা কারণে। বেতন যেন এমন হয় যে মাসের শেষে ফেলে রাখে কিছু পয়সা সিনেমা দেখার জন্য, রেস্তোরাঁয় খাওয়ার জন্য, বাচ্চাকে জুতো কিনে দেওয়ার জন্য। যেন বাঁচা মানে শুধু বাঁচা না, যেন কিছু মিষ্টি স্বাদও আছে।
মধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় সংকট ‘দৃশ্যমান না হওয়া’। ধনীর বিলাসিতা যেমন চোখ ধাঁধায়, গরিবের অভাব যেমন হৃদয় বিদ্ধ করে, মধ্যবিত্তের টানাপড়েনটা যেন খুব নীরব। ভিতরে ফুটছে পানি, কিন্তু মুখে হাসি। বলে, ‘আলহামদুলিল্লাহ, সব ঠিক আছে।’ ঠিক আছে তো সত্যি, কিন্তু আর একটু পাশ ফিরলেই যে ‘ঠিক ছিল’ আর ‘ঠিক নেই’–এর মাঝখানের পাতলা দেয়ালটা ভাঙবে, সেটা কাউকে বলে না তারা।
প্রশ্ন হলো, কবে এই দেয়ালের কথাটি কেউ শুনবে? কবে নীতি নির্ধারণীরা বুঝবেন, ‘মধ্যবিত্ত’ শব্দটা কোনো পরিসংখ্যানের নাম নয়। এরা হচ্ছে শহর আর গ্রামের সেতু, স্বপ্ন আর সীমাবদ্ধতার যুদ্ধক্ষেত্র। এরা দেশ চালায় দায়িত্ব নিয়ে, কর দেয় সময়মতো, সন্তান পড়ায় কঠিন পাঠ, ভাবে আগামীর কথা। কিন্তু যখন ফেরারি ঋণ, মূল্যস্ফীতি, অস্থির বাজারে এরা পড়ে হুমড়ি খেয়ে, তখন চেঁচামেচির ভিড়ে এদের গলা প্রায় খোঁজা যায় না।
শেষ পর্যন্ত কেবল একটি বেদনার সত্য থেকে যায়। গরিবের জন্য সহানুভূতি আছে, ধনীর জন্য সুযোগ আছে। আর মাঝের সেই পিষ্ট মানুষটি, যে রাত জেগে হিসেব কষে, গুনে রাখে শেষ টাকাটুকু। তার অদৃশ্য কান্নাটুকু পড়ে থাকে হাওয়ায় ভেসে যাওয়া এক পাতা জার্নালের মতো। চোখের পাতায় শুধু ফুটে ওঠে একটি প্রশ্ন- কবে কেউ ফিরে দেখবে মাঝখানটায়?



