বরিশাল
লাখো কৃষকের মাথায় হাত, লোকসান প্রায় ৯০০ কোটি টাকা

ছবি: আগামীর সময়
অস্বাভাবিক ভারী বর্ষণে বরিশাল অঞ্চলের কৃষি খাতে ব্যাপক বিপর্যয় নেমে এসেছে। মাঠে থাকা পাকা ও আধাপাকা ফসলের পাশাপাশি বীজতলা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় এই অঞ্চলের ১ লাখ ৮৫৯ জন কৃষক চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টিপাতে পুরো বিভাগে ৮৪০ কোটি ৫২ লক্ষ টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। জেলাওয়ারি হিসেবে বরগুনায় সর্বোচ্চ ৪৩ হাজার ৬৪০ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এছাড়া পটুয়াখালীতে ৩০ হাজার ৬২৬, ভোলায় ২৩ হাজার ৩৭৩, পিরোজপুরে ১ হাজার ২০ এবং ঝালকাঠিতে ১ হাজার ৩০০ জন কৃষক ক্ষতির শিকার হয়েছেন।
ফসল ভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি লোকসান হয়েছে মুগ ডালে যার পরিমাণ ৩২২ কোটি ৬৪ লক্ষ টাকা। এছাড়া মিষ্টি আলুতে ১০৪ কোটি ৮৬ লক্ষ, সূর্যমুখীতে ৮৯ কোটি ৬৩ লক্ষ, চিনা বাদামে ৮৩ কোটি ৪১ লক্ষ, ভুট্টায় ৭৭ কোটি ৪২ লক্ষ এবং বোরো ধানে ৬২ কোটি ৭৯ লক্ষ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
ভুক্তভোগী কৃষকরা জানান, কয়েক দিনের টানা বর্ষণে জমিতে পানি জমে থাকায় ফসল পচে নষ্ট হয়ে গেছে। ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করা কৃষকরা এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
বরগুনার বামনা উপজেলার বুকাবুনিয়ার কৃষক ছত্তার আলী আক্ষেপ করে বললেন, মুগ ডাল কাটার জন্য প্রায় প্রস্তুত ছিল কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টিতে সব পানির নিচে চলে গেছে। এতে তার প্রায় চার লক্ষ টাকার ক্ষতি হয়েছে যা পোষানোর কোনো সুযোগ নেই।
পিরোজপুরের কাউখালীর চিনা বাদাম চাষী রমজান মৃধা জানিয়েছেন, তিন একর জমির বাদাম ঘরে তোলার কয়েক দিন আগেই পুরো ক্ষেত পানিতে তলিয়ে সব নষ্ট হয়ে গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত ৭৬ হাজার ৬৮৯ হেক্টর জমির মুগ ডাল এবং ৭৫ হাজার ৬১১ হেক্টর জমির বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতি বড় ধাক্কা খেয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আবহাওয়ার এই অস্বাভাবিক আচরণ কৃষিতে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. জামাল উদ্দিনের ভাষ্য, প্রতিবছরই এই সময়ে বৃষ্টি হয় কিন্তু এই মৌসুমে তা ছিল অস্বাভাবিক। পরিবেশের বিপর্যয়ের ফলে গত কয়েক বছর ধরেই মাত্রাতিরিক্ত গরম, বন্যা ও বজ্রপাত বেড়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বরিশাল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ড. নজরুল ইসলাম সিকদার জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে খুব দ্রুত ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সরকারি বরাদ্দ পাওয়া যাবে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে কৃষকদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
সব মিলিয়ে মুগ ডাল, বোরো ধান, চিনা বাদাম ও সয়াবিনসহ বিভিন্ন রবিশস্য ও গ্রীষ্মকালীন সবজির এই বিপুল ক্ষতি বরিশাল অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।



