ইরান যুদ্ধ
বোমার শব্দে ভেঙে পড়া জীবন

ইরানের তেহরানে বিমান হামলার পর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। ছবি: সংগৃহীত
একটা সময় পর্যন্ত যুদ্ধ ছিল তেহরানের অন্য কোথাও ঘটে চলা কোনো দূরবর্তী ঘটনা। তখন সেতারেহ এবং তার সহকর্মীদের জীবনে এর কোনো প্রভাব পড়েনি। তারপর একদিন হঠাৎ এক ভয়ঙ্কর শব্দ শুনতে পেলেন সেতারেহ। কিছু বুঝে উঠার আগেই একটা বিশাল কম্পনে কেঁপে উঠে তার অফিসের চারপাশ।
আতঙ্কিত সেতারেহ তার সহকর্মীদের ডেকে বললেন, আমার মনে হয় এটা বোমার শব্দ। তখন সবাই ডেস্ক ছেড়ে দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে গেল।
সেতারেহ স্মৃতিচারণ করে আরও বললেন, ছাদে উঠে আমরা আকাশে ধোঁয়া উঠতে দেখছিলাম। কিন্তু বুঝতে পারছিলাম না কোথায় আঘাত করা হয়েছে। এরপর পুরো অফিসে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সবাই চিৎকার করছিল, দৌড়াচ্ছিল। এক থেকে দুই ঘণ্টা ধরে পুরো পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল। সেই দিনই তাদের বস অফিস বন্ধ করে দেন। একইসঙ্গে সবাইকে ছাঁটাই করেন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কঠোর রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপ সত্ত্বেও বিবিসি বিভিন্ন শহরে থাকা নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে ইরানের সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নিরাপত্তার কারণে সেতারেহ’র আসল নাম বা পেশার কোনো বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি। তবে এটুকু বলা যায়, তিনি তেহরানের একজন তরুণী, যে কাজ করতে ভালোবাসেন। সেখানে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দেখা, জীবনের গল্প ভাগাভাগি আর নিয়মিত আয়ের নিশ্চয়তা ছিল।
এখন প্রতিরাতের বোমাবর্ষণ তার স্বাভাবিক ঘুম কেড়ে নিয়েছে। তিনি জেগে থাকেন আর বর্তমান ও ভবিষ্যতের চিন্তায় অস্থির হয়ে থাকেন।
সেতারেহ বিবিসিকে বলেছেন, ‘আমি সত্যি বলতে পারি, আমি টানা কয়েকদিন ও রাত ঘুমাইনি। আমি খুব শক্তিশালী ব্যথানাশক ওষুধ খেয়ে আরাম করার চেষ্টা করি, যাতে ঘুমাতে পারি। উদ্বেগ এতটাই তীব্র যে তা আমার শরীরকে প্রভাবিত করেছে। আমি যখন ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করি এবং সেই পরিস্থিতি কল্পনা করি, তখন সত্যিই বুঝতে পারি না কী করব।’
সেই পরিস্থিতি বলতে তিনি অর্থনৈতিক সংকট এবং ভবিষ্যতে সরকার ও তার বিরোধীদের মধ্যে রাস্তায় রাস্তায় সংঘর্ষের শঙ্কাকে বোঝান। যুদ্ধ তার চাকরি কেড়ে নিয়েছে, আর হাতে থাকা অর্থও শেষের পথে।
সেতারেহ’র মতো লাখো ইরানি এমন অবস্থায় রয়েছে। যুদ্ধের আগেই দেশটির অর্থনীতি ভয়াবহ সংকটে ছিল। যেখানে এক বছরে খাদ্যের দাম বেড়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ। সেতারেহ জানায়, মানুষ বেঁচে থাকার মতো সামর্থ্য হারিয়ে ফেলছে।
হতাশ ভরা কণ্ঠে তিনি বললেন, আমরা ন্যূনতম খাবারও কিনতে পারছি না। পকেটে যা আছে, বাজারদরের সঙ্গে তার কোনো মিল নেই। বহু বছর ধরে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকায় আমরা কোনো সঞ্চয় গড়ে তুলতে পারিনি। যাদের কাছ থেকে সাহায্য পাওয়ার আশা ছিল, তারাও এখন নিঃস্ব।
অর্থনৈতিক এই দুরবস্থা থেকেই ইরানে ২০২৫ সালের শেষ ও ২০২৬ সালের শুরুতে দেশজুড়ে বিক্ষোভ দেখা দেয়। সেতারেহ মনে করে, এমন বিক্ষোভ আবারও হতে পারে।
‘আমি জানি না বেকারত্বের এই বিশাল ঢেউ কীভাবে সামলানো হবে। কোনো সহায়তা নেই, আবার সরকারও এই সব বেকার মানুষের জন্য কিছুই করবে না। আমি বিশ্বাস করি, এই যুদ্ধ কোনো ফলাফল ছাড়াই শেষ হলে প্রকৃত যুদ্ধ শুরু হবে। তিনি শুধু চান বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন হোক।
বিবিসি ইরানের ছয়টি ভিন্ন শহরের স্থানীয় সূত্র থেকে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেছে। তথ্যগুলো ছিল সমাজের নানা স্তরের মানুষ- দোকানদার, ট্যাক্সিচালক, সরকারি খাতের কর্মী ও অন্যান্যদের সঙ্গে কথোপকথন।
সবাই বাড়তি অর্থনৈতিক চাপের বর্ণনা দিয়েছেন এবং অধিকাংশই আশঙ্কা করছেন যুদ্ধ সরকারের পতন ঘটাতে পারে।
এদিকে তেহরানের বাইরে একটি হাসপাতালে কর্মরত নার্স ‘টিনা’ ওষুধের ঘাটতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তিনি বললেন, ঘাটতি এখনও মারাত্মক হয়নি, কিন্তু শুরু হয়ে গেছে।
তিনি আরও বললেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই যুদ্ধ যেন হাসপাতালে না পৌঁছায়। যদি সংঘাত দীর্ঘায়িত হয় এবং অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয় আর ওষুধ আমদানি করা না যায়, তাহলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহে যুদ্ধের যে ভয়াবহ ছবি তিনি দেখেছেন তা তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। বোমা হামলার পর হাসপাতালে আনা হয় এমন সব লাশ, যেগুলো চেনার উপায় ছিল না—কারও হাত নেই, কারও পা নেই।
একটি স্মৃতি তাকে বিশেষভাবে নাড়া দেয়—যুদ্ধের শুরুর দিকে এক গর্ভবতী নারীর মৃত্যু। তিনি যুদ্ধের শুরুতেই একটি বিমান হামলায় আটকা পড়েছিলেন। তার বাড়ি ছিল একটি সামরিক স্থাপনার কাছে। বোমা হামলায় বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হাসপাতালে আনার পর দেখা যায়, মা এবং তার গর্ভস্থ সন্তান—দুজনই মৃত। আর মাত্র দুই মাস পর তার সন্তান জন্ম নিত। এটি খুব ভয়াবহ পরিস্থিতি ছিল।
এই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে টিনার শৈশবের স্মৃতি। ১৯৮০-এর দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তার মা গর্ভবতী ছিলেন এবং বোমা থেকে বাঁচতে আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে যেতেন। সেই যুদ্ধ প্রায় দশ লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়।
যুদ্ধের সেই উত্তরাধিকার টিনাকে নার্স হতে অনুপ্রাণিত করেছিল। তিনি বলেন, সেই গল্পগুলো শুনে আমি সবসময় থমকে দাঁড়াতাম আর নিজেকে সেই পরিস্থিতিতে কল্পনা করতাম এবং তার জায়গায় নিজেকে রাখতাম। এখন দেখছি, আমি নিজেই সেই একই অবস্থার মধ্যে আছি। ইতিহাস এত দ্রুত পুনরাবৃত্তি হতে পারে, তা বিশ্বাস করা কঠিন।
ইরানে অসন্তোষের কোনো প্রকাশ্য প্রদর্শন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। শাসক তার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনী ও অনুগত সমর্থকদের রাস্তায় টহল দিতে মোতায়েন করেছে। গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও মৃত্যুদণ্ড চলছে।
জানুয়ারির সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় ইরানের হাজার হাজার নাগরিককে হত্যা করা হয়। বেহনাম সেসময়ের একজন সাবেক রাজনৈতিক বন্দী। তিনি জানান, সাম্প্রতিক বিক্ষোভে সরকার হাজারো মানুষকে হত্যা করেছে এবং আবারও তা করতে দ্বিধা করবে না।
বেহনাম ভবিষ্যৎ সংঘর্ষের আশঙ্কায় বাসায় অ্যান্টিবায়োটিক ও ব্যথানাশক মজুত করে রেখেছেন। আগের বিক্ষোভে গুলিবিদ্ধ হয়ে এখনো শরীরে রয়ে গেছে ধাতব টুকরো।
তিনি বলেন, একবার যখন বুঝে ফেলেন জীবন কত সহজে হুমকির মুখে পড়ে। তখন নিজের জীবনের মূল্য আর আগের মতো থাকে না।
শৈশবে বেহনাম তার বাবা-মায়ের কাছে ভয়ংকর নির্যাতনের বিবরণ শুনতেন। ভয় ছিল তাদের জীবনের নির্ধারক ফ্যাক্টর। নখ উপড়ে ফেলা, শারীরিক নির্যাতন, অপমান— এসব গল্প তার জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
তিনি বলেন, আমি সুস্থ হব না, যতক্ষণ না আমরা মুক্ত হই। আমি বিশ্বাস করি, একদিন আমরা এই কষ্টের দিনগুলোকে পেছনে ফেলে হাসতে পারব।
কিন্তু যুদ্ধের এক মাস পর, যখন আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে এবং দমন-পীড়ন আরও কঠোর হচ্ছে, তখন সেই হাসির দিন যেন অনেক দূরের কোনো স্বপ্ন।
সূত্র: বিবিসি

