আগামীর সময়

থামছে না মশার কামড়

থামছে না মশার কামড়

আগামীর সময় গ্রাফিক্স

বুধবার রাত আটটা। চট্টগ্রাম নগরীর বহদ্দারহাট মোড়। বন্ধুর জন্য অপেক্ষায় ছিলেন আইনজীবী জাহেদুল ইসলাম। মশার উৎপাতে তিনি ১০ মিনিটও টিকতে পারেননি। বাসায় গিয়ে দেখেন হাত-পা মশার কামড়ে লাল হয়ে গেছে।

শুধু জাহেদ নয়, মশার ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবে অতিষ্ঠ পুরো নগরবাসী। মশার উপদ্রব অতীতের যেকোন সময়ের চেয়ে বেশি বলছেন তারা। অথচ মশা নিধনে প্রতিবছর প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয় করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। এর সুফল নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন নাগরিকরা।

২০২২ সাল থেকে গত চারবছরে চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ২২০ জন। আক্রান্ত হয়েছেন ২৮ হাজার ৭১৯ জন। চলতি বছরের তিনমাসে ১১৩ জন আক্রান্ত হয়েছেন। মৃত্যু হয়েছে একজনের।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশার প্রাদুর্ভাব বাড়লেই মশা নিয়ন্ত্রণে মাঠে নামে চসিক। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই সব কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। ফলে মশা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। প্রয়োজন বছরজুড়ে কার্যক্রম। এছাড়া কার্যকর ওষুধের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

সিটি করপোরেশনের হিসেব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মশা নিয়ন্ত্রণে ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয় করেছে চসিক। চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৯ কোটি টাকা। আড়াই দশকে মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশন ব্যয় করেছে ৪১ কোটি টাকা।

২০২১ সালের মেয়র নির্বাচিত হন রেজাউল করিম চৌধুরী। তার চারবছর দায়িত্বপালনকালে ব্যয় হয়েছে সাত কোটি ৪৬ লাখ টাকা। ২০১৫ সালে নির্বাচিত হওয়া মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের মেয়াদে মশা নিধনে ব্যয় করা হয়েছে ৮ কোটি ৩০ লাখ টাকা।

২০১০ সালের জুনে মেয়র নির্বাচিত হয়ে এম মনজুর আলম এ খাতে ব্যয় করেেন ৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ২০০০ সাল থেকে দ্বিতীয়বার মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে ২০১০ সালের জুন পর্যন্ত এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর মেয়াদে ব্যয় হয়েছে ১২ কোটি ৪০ লাখ টাকা।

এদিকে নগরের চান্দগাঁও, মোহরা, বহদ্দারহাট, শুলকবহর, হামজারবাগ, নন্দনকানন, লাভলেন, জামালখান, কাজীর দেউড়ি,কাতালগঞ্জ, কাপাসগোলা, উত্তর কাট্টলী, ফরিদারপাড়া, বাকলিয়া, কে বি আমান আলী সড়ক, চকবাজার এলাকায় মশার উপদ্রব বেড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। একই অবস্থা নগরের অন্যান্য এলাকায়ও।

পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকার বাসিন্দা মাছুমা আক্তার জানালেন দুর্ভোগের কথা। ‘গরমের মধ্যেও সন্ধ্যার পর মশার উৎপাতের কারণে দরজা-জানলা খোলা রাখা যাচ্ছে না। রাতে মশারি টাঙিয়েও মশা ঠেকানো যাচ্ছে না। সারারাত জেগে মশা মারতে হয়। শিশু সন্তান নিয়ে আতঙ্কে কাটে রাত।’

নগরের চান্দগাঁও থানার ফরিদারপাড়া এলাকার গৃহিণী উম্মে সাদিয়া সদ্য মা হয়েছেন। শিশু সন্তানকে নিয়ে তার অভিজ্ঞতা আরও করুণ। ‘মেয়েকে নিয়ে সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকি। মশারি দিয়ে বাচ্চাকে রেখেও মশার কামড় থেকে রেহাই মিলছে না। দিনের বেলাও মশারি টাঙিয়ে রাখতে হচ্ছে।’

সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মশার লার্ভা নিধনে স্প্রে মেশিন দিয়ে ছিটানো হয় কীটনাশক লার্ভিসাইড ও পূর্ণবয়স্ক বা উড়ন্ত মশা নিধনে ফগার মেশিন দিয়ে অ্যাডাল্টিসাইড ছিটানো হয়। দীর্ঘদিন এসব ওষুধ ছিটানোর কারণে মশার মধ্যে প্রতিরোধী ক্ষমতা গড়ে উঠেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিষয়টির সঙ্গে একমত পোষণ করলেন সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদ চৌধুরী। ‘কয়েকবছর ধরে মশা নিয়ন্ত্রণে অ্যাডাল্টিসাইড ডেল্টামেথ্রিন ব্যবহার করা হচ্ছে। হয়তো মশা এই ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে। তাই নতুন ওষুধ ম্যালাথিয়ন কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া আধুনিক প্রযুক্তির কীটনাশক বিটিআইও ব্যবহার করা হচ্ছে। মশা নিয়ন্ত্রণে চেষ্টার কোন কমতি নেই।’

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুকের মত, ‘মশা নিয়ন্ত্রণে সফল দেশগুলো সারাবছর ধরেই জৈবিক ও রাসায়নিক দমন পদ্ধতির সমন্বিত প্রয়োগ করে মশা ও মশাবাহী রোগ দমনে সফলতা পেয়েছে। চট্টগ্রামে মশার প্রাদুর্ভাব হলেই শুধু তৎপরতা দেখা যায়।’

    শেয়ার করুন: