বন্ধ হয়ে গেল ইস্টার্ন রিফাইনারি

অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)-এর পরিশোধন কার্যক্রম মঙ্গলবার রাত থেকেই বন্ধ হয়ে গেছে।
আমদানি হওয়া অপরিশোধিত জ্বালানি দিয়েই ইআরএল চলত; আর প্রতিদিন গড়ে ৪,৫০০ টন পরিশোধিত তেল সরবরাহ করা হতো। ইরান-আমেরিকার যুদ্ধের কারণে ১৮ ফেব্রুয়ারির পর দেশে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের জাহাজ চট্টগ্রামে আসেনি। এতদিন মজুদ থাকা তেল দিয়েই পরিশোধন কাজ চলছিল। ৬ এপ্রিল এসে সেই মজুদ শেষ হয়ে যায়। এরপর পাইপলাইন এবং ট্যাংকে থাকা ‘ডেডস্টক’ বা তলানির তেল ব্যবহার করে উৎপাদন প্রক্রিয়া ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত সচল রেখেছিল। সেই মজুদ শেষ হওয়ায় ১৪ এপ্রিল রাত থেকেই উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায় প্রতিষ্ঠানটির।
মধ্যপ্রাচ্যের বদলে বিকল্প হিসেবে মালয়েশিয়া থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের একটি জাহাজ মে মাসের প্রথম সপ্তাহে দেশে পৌঁছার চেষ্টা করা হচ্ছে। সেটি পৌঁছলে কার্যক্রম আবার শুরু হবে
ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য প্রধানত মধ্যপ্রাচ্যের দেশ থেকে তেল কিনে সরবরাহ দেয় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। সেই দেশগুলো থেকে তেল কিনলেও ইরান নিয়ন্ত্রিত হরমুজ প্রণালি দিয়ে দেশে আসতে পারছে না। এই অবস্থায় বিপিসি হরমুজ এড়িয়ে বিকল্প দেশ থেকে পরিশোধিত এবং অপরিশোধিত দুই ধরনের তেল এনে দেশের সরবরাহ সংকট সামাল দিতে চাইছে।
ইস্টার্ন রিফাইনারির অপারেশন কার্যক্রম বন্ধের খবর বুধবার দুপুর থেকে অফিশিয়ালি জানার চেষ্টা করে আগামীর সময়। কিন্তু বিকেল পর্যন্ত রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরীফ হাসনাত থেকে শুরু করে শীর্ষ ১২ কর্মকর্তাকে ফোন দেয় আগামীর সময়। প্রায় প্রত্যেকেই ফোন বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে নিজস্ব সোর্স থেকে জানতে পারে, জ্বালানি মন্ত্রণালয় ছাড়া এ বিষয়ে কেউই কথা বলবে না। সবাইকে গণমাধ্যমে কথা বলতে মানা করা হয়েছে।
ইস্টার্ন রিফাইনারির এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম না জানিয়ে আগামীর সময়কে বলছেন, ‘১৪ এপ্রিল রাত পর্যন্ত কোনোমতে কার্যক্রম টেনে নেওয়া সম্ভব হয়েছে। মজুদ শেষ হওয়ার পর থেকেই কার্যক্রম বন্ধ আছে। মধ্যপ্রাচ্যের বদলে বিকল্প হিসেবে মালয়েশিয়া থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের একটি জাহাজ মে মাসের প্রথম সপ্তাহে দেশে পৌঁছার চেষ্টা করা হচ্ছে। সেটি পৌঁছলে কার্যক্রম আবার শুরু হবে।’
তার মতে, অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বদলে সরকার বেশি দাম দিয়ে হলেও পরিশোধিত বা রেডি জ্বালানি তেল আমদানি করে সরবরাহ সংকট সামাল দিতে সাধ্যমতো চেষ্টা করছে। সেটি করা গেলে সংকট সামাল দেওয়া যাবে।
জানা গেছে, ফেব্রুয়ারির ১৮ তারিখ পর্যন্ত রিফাইনারিটি তার স্বাভাবিক সক্ষমতা অনুযায়ী দৈনিক গড়ে প্রায় ৪,৫০০ টন ক্রুড অয়েল শোধন করছিল। এরপর ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ-মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার কারণে তেলের জাহাজ দেশে আসতে বিঘ্ন ঘটে। তবে ফেব্রুয়ারি মাসের বাকি দিনগুলো মজুদ থাকা তেল দিয়ে স্বাভাবিক উৎপাদন বজায় রাখা সম্ভব হয়েছিল।
মার্চ মাস থেকে ক্রুড অয়েলের সংকট প্রকট হতে শুরু করায় রিফাইনারি কর্তৃপক্ষ কৌশলে উৎপাদন কমিয়ে দেয়। মার্চের শুরু থেকেই দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ৪,৫০০ টন থেকে কমিয়ে গড়ে ৩,৫০০ টনে নামিয়ে আনা হয়। অর্থাৎ মার্চ মাসে সক্ষমতার ২২ শতাংশ উৎপাদন কমানো হয়েছিল, যাতে মজুদ থাকা তেল দিয়ে বেশিদিন চালানো যায়।
এপ্রিলের শুরুর দিকে ব্যবহারযোগ্য ক্রুড অয়েলের মজুদ ২,০০০ টনের নিচে নেমে এসেছিল। এই অবস্থায় পরিস্থিতি সামাল দিতে ডেডস্টক ব্যবহার করেই উৎপাদনে সচলের সিদ্ধান্ত কার্যকর করে ইআরএল কর্তৃপক্ষ। ৪ এপ্রিল থেকে সেই উৎপাদন চলে ১৪ এপ্রিল রাত পর্যন্ত। এর পর থেকে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
অপরিশোধিত যে জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ প্রথমে বঙ্গোপসাগরের নোঙর করে। এই জাহাজটি সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিংয়ে (এসপিএম) সংযোগ করে পানি-মাটির নিচে নির্মিত পাইপলাইনের মাধ্যমে পতেঙ্গার ইস্টার্ন রিফাইনারি শোধনাগারে পৌঁছে।
ইআরএল কর্মকর্তারা বলছেন, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্পের গভীর সমুদ্রের ভাসমান বয়া থেকে মহেশখালীর স্টোরেজ ট্যাংক এবং সেখান থেকে ইআরএল পর্যন্ত বিস্তৃত পাইপলাইনের ভেতরে সব সময় একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল জমা রাখতে হয়। পাইপলাইনের কার্যকারিতা এবং হাইড্রোলিক চাপ বজায় রাখতে যে সর্বনিম্ন পরিমাণ তেল ভেতরে থেকে যায়, যা সাধারণত উত্তোলন করা হয় না, তাকেই ডেডস্টক বা তলানির তেল বলা হয়।



