মরুপ্রান্তরে যে নারী লিখেছিলেন জীবনের মহাকাব্য
- মরুর বুকে ইমানের অমর গল্প
- যে মায়ের বিশ্বাসে মরু হয়ে উঠল জীবন
- যে মায়ের দৌড়ে জন্ম নেয় সভ্যতার আলো

ছবি: আগামীর সময়
আর কয়েক দিন পর বিশ্ব মা দিবস। সেই উপলক্ষে দেশের প্রিন্ট মিডিয়ার পাতায় পাতায়, আর ইলেকট্রনিক মিডিয়ার পর্দায় উঠে আসবে অসংখ্য সংগ্রামী মায়ের বীরত্ব, ত্যাগ, অসহায়ত্ব আর আবেগঘন গল্প।
এই প্রেক্ষাপটে আমরা একটু আগেই কথা বলতে চাই এমন এক মহীয়সী মাকে নিয়ে; যার সংগ্রামী পদক্ষেপ ও অটল দৃঢ়তা জন্ম দিয়েছে এক নতুন সভ্যতার। তিনি হয়ে উঠেছেন কিয়ামত পর্যন্ত সব সংগ্রামী মায়ের জন্য পথপ্রদর্শক ও আলোকবর্তিকা।
একটু ভাবুন তো; মরুভূমির বিস্তৃত নীরবতা। চারদিকে শুধু শূন্যতা আর তপ্ত বাতাসের হাহাকার। সেই পরিবেশে ছোট্ট শিশুপুত্রকে সঙ্গে নিয়ে একটি অনুর্বর নির্জন উপত্যকায় একা একজন নারী। চোখে অজানা ভবিষ্যতের প্রশ্ন। এই দৃশ্যটি কেবল মানবিক কষ্টের নয়, বরং এটি এমন এক ইমানি দৃঢ়তা, যা পরে মানব ইতিহাসকে নতুনভাবে লিখেছে।
আমরা বলছি সাইয়্যেদা হাজেরা (আ.)-কে নিয়ে। তিনিই ছিলেন সেই নারী, যিনি নিঃসঙ্গতাকে পরাজিত করেছিলেন বিশ্বাস দিয়ে, আর অনিশ্চয়তাকে রূপ দিয়েছিলেন আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসায়। তার জীবনের এ অধ্যায় কেবল একটি ঘটনা নয়, বরং ইমানের এক জীবন্ত পাঠশালা।
বিশ্বাস যখন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়
ইব্রাহিম (আ.) মহান আল্লাহর নির্দেশে যখন হাজেরা (আ.)-কে মরুর বুকে রেখে আসছেন। তখন পৃথিবীর দৃষ্টিতে এটি ছিল এক চরম পরিত্যাগ। কিন্তু ইমানের দৃষ্টিতে এটি ছিল আল্লাহর পরিকল্পনার অংশ। যা হাজেরা (আ.) খুব ভালো করেই উপলব্ধি করতে পারছিলেন। যেই কারণে এমন কঠিনতর মুহূর্তেও তার অন্তরের ভাষা ছিল নীরব, কিন্তু গভীর। তিনি প্রশ্ন করেননি, অভিযোগ করেননি। বরং তার অন্তর যেন বলছিল, ‘হাসবুনাল্লাহু’ আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট।
এই বিশ্বাসই তাকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল এমন এক পরীক্ষায়, যেখানে সাধারণ মানুষ ভেঙে পড়ে যায়।
সাফা ও মারওয়ায় অস্থির পদচারণা
শিশু ইসমাইল (আ.)-এর তৃষ্ণার্ত। পুত্রের কান্না মায়ের নরম মন ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে, মরুর উত্তপ্ত বাতাস আর আশপাশের নির্জনতা সেই পরিবেশটা আরও অসহ্য করে তুলছে। সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি। কিন্তু হাজেরা (আ.) থেমে যাননি।
তিনি ছুটে যান সাফা পাহাড়ে, আবার ফিরে আসেন মারওয়ায়। এই দৌড় কোনো সাধারণ দৌড় ছিল না। এটি ছিল এক মায়ের দোয়া, এক নারীর সংগ্রাম, এক হৃদয়ের আল্লাহর দরবারে আর্তনাদ। আজও পবিত্র কোরআন এই স্মৃতিকে জীবন্ত করে রেখেছে। মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন— ‘নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা বাকারা আয়াত : ১৫৮)
হাজেরা (আ.)-এর সেই দৌড়, সেই প্রচেষ্টা, সেই সংগ্রাম; কেবল ইতিহাস নয়, আজ তা ইবাদতের অংশ হয়ে গেছে। সারা বছর কোটি কোটি নারী-পুরুষ হজ ও ওমরায় গিয়ে সেই সাফা আর মারওয়াতে দৌড় দেন।
মরুর বুকে আল্লাহর রহমতের বিস্ফোরণ
যখন সব পথ বন্ধ মনে হচ্ছিল, তখন মায়ের এই অদম্য সংগ্রামের পরিপ্রেক্ষিতেই অদৃশ্যভাবে নেমে আসে আল্লাহর সাহায্য। শিশু ইসমাইলের পায়ের নিচ থেকে ফেটে বের হয় পানির ধারা। মরুভূমির বুকে জন্ম নেয় জমজম।
এই ঘটনা কেবল একটি অলৌকিকতা নয়, বরং একটি ঘোষণা— যে চেষ্টা করে, আল্লাহ তাকে ব্যর্থ করেন না।
মায়ের সংগ্রামে গড়ে ওঠা সভ্যতার ভিত্তি
হাজেরা (আ.)-এর সংগ্রাম এখানেই থেমে থাকেননি। মরুর বুকে যে স্থানটি ছিল নির্জন ও শূন্য, সেটিই ধীরে ধীরে পরিণত হয় জনপদে। তার সাহসিকতা ও ধৈর্যের ফলে সেই নির্জন প্রান্তর আস্তে আস্তে হতে থাকে শান্তির নিবাস। সময়ের পরিক্রমায় সেখানে আসতে শুরু করে মানুষ, গড়ে ওঠে মক্কা নগরীর ভিত্তি।
একজন মা, যিনি কোনো বাহিনী নিয়ে আসেননি, কোনো রাজত্ব ঘোষণা করেননি, শুধু বিশ্বাস আর সংগ্রাম নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনিই হয়ে উঠলেন এক সভ্যতার অদৃশ্য নির্মাতা।
আজকের মানবতার জন্য রেখে যাওয়া বার্তা
হাজেরা (আ.) আমাদের শেখান, জীবন সবসময় নিখুঁত অবস্থায় শুরু হয় না। অনেক সময় মরুর মতো শূন্য পরিস্থিতি নিয়েও শুরু করতে হয়। কিন্তু সেই শূন্যতার মাঝেও যদি বিশ্বাস থাকে, চেষ্টা থাকে, তবে সেখান থেকেই জন্ম নিতে পারে জমজমের মতো অমর উৎস।
এই সংগ্রামী মায়ের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সাফল্য কখনো কেবল অপেক্ষার ফল নয়, বরং তা হলো দোয়া, চেষ্টা এবং ধৈর্যের সম্মিলিত ফল।
মরুর বুকে এক মা কেবল দৌড়াননি, তিনি লিখেছেন এক জীবন্ত মহাকাব্য। সেই মহাকাব্য আজও প্রতিটি হজযাত্রীর পদচারণায় আবার জীবন্ত হয়, প্রতিটি তৃষ্ণার্ত হৃদয়ে নতুন অর্থ খুঁজে পায়।
হাজেরা (আ.)-এর গল্প আমাদের বলে দেয়, আল্লাহর ওপর ভরসা করে যদি মানুষ উঠে দাঁড়ায়, তবে শূন্যতাও ইতিহাসে পরিণত হয়।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক
saifpas352@gmail.com



