রাবি থেকে ঢাবি যেতে কপি-পেস্ট গবেষণা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) অধ্যাপক ড. মো. আতাউল্যাহ। হতে চান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষক। জমা দিয়েছেন বিতর্কিত ছয়টি গবেষণা প্রবন্ধ। যে গবেষণায় আবার জালিয়াতির গুরুতর অভিযোগ। অধ্যাপক আতাউল্যাহর পিএইচডি থিসিস ছিল ইরানি কবি নিযামী গাঞ্জুবীকে নিয়ে। অভিযোগ উঠেছে, সেই থিসিস থেকেই করেছেন হুবহু কপি। কোনো পরিবর্তন ছাড়াই বানিয়েছেন ছয়টি প্রবন্ধ। এমনকি দাঁড়ি-কমা পর্যন্ত বদলাননি।
আগামীর সময়ের অনুসন্ধানেও দেখা গেছে মিল। প্রতিটি প্রবন্ধের ভূমিকা ও জীবনবৃত্তান্ত হুবহু নেওয়া থিসিস থেকে। নিযামী গাঞ্জুবীর কাব্য-প্রতিভা : এই প্রবন্ধে থিসিসের ১৫টির বেশি পৃষ্ঠা হুবহু কপি। কাব্যে আল-কুরআনের প্রভাব : থিসিসের ১৪৭ থেকে ১৬১ নম্বর পৃষ্ঠা সরাসরি নকল। দার্শনিক চিন্তাধারা : এখানেও ১২২ থেকে ১৩৫ নম্বর পৃষ্ঠা তুলে দেওয়া হয়েছে হুবহু। বাকি তিনটি প্রবন্ধেও একইভাবে পেস্ট করা হয়েছে থিসিসের পাতাগুলো। কোথাও দেওয়া হয়নি কোনো রেফারেন্স বা সাইটেশন।
গবেষণায় চৌর্যবৃত্তি বা প্লেজিয়ারিজমের এমনই গুরুতর অভিযোগ উঠেছে রাবির ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক আতাউল্যাহর বিরুদ্ধে। অভিযোগ, নিজের পিএইচডি অভিসন্দর্ভ (থিসিস) থেকে বহু অংশ হুবহু কপি-পেস্ট করে প্রকাশ করেছেন অন্তত ছয়টি গবেষণা প্রবন্ধ। সম্প্রতি সেই প্রবন্ধগুলোই জমা দিয়েছেন ঢাবির ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে বিজ্ঞাপিত অধ্যাপক পদে আবেদনের সঙ্গে।
জানা গেছে, ইরানি কবি নিযামী গাঞ্জুবীকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত ছয়টি গবেষণা প্রবন্ধ তিনি উপস্থাপন করেছেন নিজের অ্যাকাডেমিক যোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে। এই ইরানি কবির ওপরই সম্পন্ন করেন তার পিএইচডি গবেষণা। যে থিসিসের শিরোনাম ‘নিযামী গাঞ্জুবীর কাব্য-প্রতিভা ও প্রেম দর্শন’।
অভিযোগ উঠেছে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গবেষণা পদ্ধতির ন্যূনতম নিয়মও অনুসরণ না করে ওই থিসিসের বহু অংশ হুবহু কপি করে গবেষণা প্রবন্ধ হিসেবে প্রকাশ করেছেন অধ্যাপক আতাউল্যাহ। ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের একাধিক শিক্ষক বলেছেন, এটি শুধু আত্মচৌর্য (সেলফ প্লেজিয়ারিজম) নয়, বরং অ্যাকাডেমিক নৈতিকতার চরম লঙ্ঘন। তারা একে মনে করছেন, গবেষণা জালিয়াতির নজিরবিহীন উদাহরণও।
যেভাবে মিলল চৌর্যবৃত্তির প্রমাণ
আগামীর সময়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রতিটি প্রবন্ধের ভূমিকা, কবির পরিচিতি এবং জন্মবৃত্তান্ত অংশ থিসিসের বিভিন্ন পৃষ্ঠা থেকে নেওয়া হয়েছে প্রায় অবিকল। ছয়টি প্রবন্ধের ভূমিকা ও জীবন পরিক্রমা অংশে ব্যবহার করা হয়েছে একই ভাষা, একই বাক্য গঠন এবং একই কাঠামো, যা সরাসরি চৌর্যবৃত্তির আওতায় পড়ে। শুধু তাই নয়, মূল প্রবন্ধের অংশেও থিসিসের অনুচ্ছেদগুলো দাঁড়ি-কমাসহ কপি-পেস্ট করা হয়েছে হুবহু। অথচ কোথাও উল্লেখ করা হয়নি থিসিসের যথাযথ উদ্ধৃতি, রেফারেন্স বা সূত্র।
এক নজরে ছয়টি প্রবন্ধ
নিযামী গাঞ্জুবীর কাব্য-প্রতিভা : একটি পর্যালোচনা ভূমিকা ও জীবন পরিক্রমা অংশে থিসিসের ১, ৫৩, ৫৪, ৫৫, ৫৭ ও ৫৮ নম্বর পৃষ্ঠা থেকে করা হয়েছে কপি। মূল অংশে ১০১ থেকে ১১৭ নম্বর পৃষ্ঠার বিস্তৃত অংশ ব্যবহার করা হয়েছে হুবহু। কোথাও থিসিসের উদ্ধৃতি নেই; নিযামী গাঞ্জুবীর কাব্যে আল-কুরআনের প্রভাব ভূমিকা অংশে ব্যবহার করা হয়েছে থিসিসের ৫৩, ৫৭ ও ৫৮ নম্বর পৃষ্ঠা। মূল অংশে ১৪৭ থেকে ১৬১ নম্বর পৃষ্ঠা পর্যন্ত অংশ কপি করা হয়েছে হুবহু; নিযামী গাঞ্জুবীর কাব্যে প্রজ্ঞা ভূমিকা অংশে নেওয়া হয়েছে ৫৩, ৫৪ ও ৫৭ নম্বর পৃষ্ঠা থেকে। মূল অংশে ১৪০ থেকে ১৪৭ নম্বর পৃষ্ঠা পর্যন্ত করা হয়েছে কপি; নিযামী গাঞ্জুবী কাব্যে বিষয় বৈচিত্র্য ভূমিকা অংশ নেওয়া হয়েছে ১৬৪, ৫৪, ৫৭ ও ৭৪ নম্বর পৃষ্ঠা থেকে। মূল অংশে ১৬৪ থেকে ১৭৩ নম্বর পৃষ্ঠা পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়েছে হুবহু; নিযামী গাঞ্জুবীর কাব্যে নৈতিকতা ভূমিকা অংশে নেওয়া হয়েছে ১৩৪ ও ৫৮ নম্বর পৃষ্ঠা থেকে। মূল অংশে ১৩৪ থেকে ১৪০ নম্বর পৃষ্ঠা পর্যন্ত কপি করা হয়েছে; নিযামী গাঞ্জুবীর দার্শনিক চিন্তাধারা ভূমিকা অংশে নেওয়া হয়েছে ৫৭ নম্বর পৃষ্ঠা থেকে। মূল অংশে ১২২ থেকে ১৩৫ নম্বর পৃষ্ঠা পর্যন্ত বিস্তৃত অংশ ব্যবহার করা হয়েছে হুবহু।
গবেষণা নীতিমালা কী বলে?
আন্তর্জাতিক নীতিমালা বলছে, থিসিস থেকে প্রবন্ধ তৈরির সময় হুবহু ‘কপি-পেস্ট’ নিষিদ্ধ। গবেষককে অবশ্যই থিসিসের বিস্তারিত তথ্যগুলো সংক্ষেপ করে লিখতে হবে নতুন ভাষায় এবং থিসিসের মূল ডেটা থেকে বেছে নিতে হবে প্রবন্ধের জন্য প্রয়োজনীয় অংশটুকু। এক্ষেত্রে নিজের কাজ হলেও থিসিসটিকে উৎস হিসেবে গণ্য করে যথাযথ সাইটেশন ও রেফারেন্স বাধ্যতামূলক, যাতে ‘স্ব-চুরিকরণ' (সেলফ প্লেজিয়ারিজম) এড়ানো যায়। এ ছাড়া দিতে হবে যথাযথ রেফারেন্স এবং অপ্রকাশিত থিসিস হলে উল্লেখ করতে হবে শিরোনাম, লাইব্রেরি কল নম্বর, সাল ও পৃষ্ঠা।
অধ্যাপক আতাউল্যাহর গবেষণা জালিয়াতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঢাবির ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের একজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘অধ্যাপক আতাউল্যাহর প্রকাশিত প্রবন্ধগুলোর সঙ্গে তার পিএইচডি অভিসন্দর্ভ মিলিয়ে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গবেষণা পদ্ধতির ন্যূনতম নিয়মও তিনি অনুসরণ করেননি। বরং নিজের পিএইচডি থিসিস থেকে পাতার পর পাতা হুবহু কপি-পেস্ট করে প্রকাশ করেছেন ছয়টি গবেষণা প্রবন্ধ।’
তার ভাষায়, ‘এটি নিছক অনিয়ম নয়, বরং স্পষ্ট গবেষণা জালিয়াতি। অ্যাকাডেমিক নৈতিকতার দৃষ্টিতে এটি অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। এমন গবেষণাপত্রকে মৌলিক কাজ হিসেবে উপস্থাপন করে অধ্যাপক পদে আবেদন করাও অনৈতিক এবং প্রশ্নবিদ্ধ।’
শুধু এই ছয়টি প্রবন্ধ নয়, অধ্যাপক আতাউল্ল্যাহর অন্যান্য প্রকাশিত গবেষণাপত্রও নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা হলে একই ধরনের চৌর্যবৃত্তি ও অনিয়মের আরও প্রমাণ মিলতে পারে- এমন শঙ্কার কথাও জানালেন ঢাবির ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের এই শিক্ষক। তার মতে, বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।
বিশ্লেষকরা বলছেন, থিসিস থেকে কয়েকটি অনুচ্ছেদ হুবহু তুলে এনে তা নতুন গবেষণা প্রবন্ধ হিসেবে প্রকাশ গুরুতর অ্যাকাডেমিক অসদাচরণ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেনের মতে, নিজের পিএইচডি থিসিস থেকে কিছু অংশ হুবহু কপি করে তা নতুন গবেষণা প্রবন্ধ হিসেবে প্রকাশ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গবেষণা নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ‘গবেষণাপত্র মানে নতুন বিশ্লেষণ, নতুন উপস্থাপন এবং মৌলিক অবদান। কিন্তু থিসিসের পাতার পর পাতা হুবহু কপি-পেস্ট করে সেটিকে নতুন প্রবন্ধ হিসেবে প্রকাশ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে গবেষণার মান যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি পুরো অ্যাকাডেমিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাও পড়ে প্রশ্নের মুখে।’
তবে অধ্যাপক আতাউল্যাহর দাবি, তার জমা দেওয়া ওই প্রবন্ধগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম লঙ্ঘন করেনি। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দিয়ে আর কোনোকিছু বলতে রাজি হননি।
যদিও গবেষণায় জালিয়াতির এ ধরনের অভিযোগের প্রমাণ মিললে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মো. ফরিদুল ইসলাম।



