ঘরে ফিরতে চান বাংলার জয়যাত্রার নাবিকরা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঘরে ফিরতে চান ভয়-আতঙ্কের পারস্য উপসাগরে আটকা পড়া বাংলাদেশি জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’র নাবিকরা। হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিতে গিয়ে আটকা পড়েছেন ৩১ বাংলাদেশি নাবিক। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের জেরে এই পথ এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ১০৩ দিন পারস্য উপসাগর এবং আরব সাগরে ঘুরপাক খাচ্ছে বাংলার জয়যাত্রা।
জাহাজ, জাহাজে থাকা পণ্য এবং নিজেদের নিরাপদে রাখতে কাতার থেকে আরব-আমিরাতের দীর্ঘ সাগরে নোঙর তুলছেন, আবার ফেলছেন।
যুদ্ধবিরতির কথা শুনে সাহস করে হরমুজ পাড়ি দিতে গিয়েছিলেন একাধিকবার। সফল হননি। খাবারের টান পড়ায় রেশনিং করে খাচ্ছেন। আবার সংকট মেটাতে অনেক দূর থেকে মিঠা পানি সংগ্রহ করছেন। এই সময়ে জাহাজে মিসাইল অ্যাটাক খুব কাছ থেকে দেখেছেন। দেখেছেন নাবিকরা সাঁতরে কিভাবে প্রাণে বাঁচেন। প্রতিদিনকার এই ভয়, অনিশ্চয়তার মধ্যেই ১৫ নাবিকের চুক্তির মেয়াদই পার হয়ে গেছে। ফলে ঘরে ফেরা এখন খুব সহজ, আবেদন করেছেনও। কিন্তু সায় মেলেনি।
জাহাজমালিক বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেকের ভাষ্য, ‘আমরা তো নাবিকদের সব সুবিধা দিচ্ছি। যুদ্ধঝুঁকি ভাতা পাচ্ছেন নাবিকরা। ইন্স্যুরেন্স কাভারেজ আছে। অনেক নাবিকের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। কিন্তু তাদের নামিয়ে আমি নতুন কাকে জাহাজে উঠাব!’
সাধারণত ছয়মাসের চুক্তিতে নাবিকরা পরিচালনার জন্য জাহাজে উঠেন। চুক্তি শেষে আরেক দল নাবিক জাহাজ চালান। এভাবে শিফটিং করে জাহাজ সাগরে চলে।
বাংলার জয়যাত্রা জাহাজের অন্তত ১৫ নাবিকের চুক্তির মেয়াদ ছয় থেকে আটমাস পার হয়েছে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া নাবিকরা জাহাজ থেকে নামার জন্য মৌখিক, লিখিত আবেদন করেছে। বাংলার জয়যাত্রা জাহাজ ভাড়া নেওয়া সিঙ্গাপুরের কম্পানি এবং বিএসসিকে অবহিত করেছে। কিন্তু সায় মেলেনি।
এক নাবিক বললেন, যুদ্ধবিরতি এই শুরু, এই শেষ। এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে কতদিন ভয় আতঙ্কে থাকব। আমি তো জানি না কবে হরমুজ পাড়ি দিব।
আরেক নাবিক জানালেন আইনের কথা। ‘চুক্তির মেয়াদ শেষে জাহাজ থেকে ঘরে ফেরা আমার অধিকার। আর এখন আমরা প্রতিমুহূর্তে যুদ্ধের ঝুঁকিতে আছি। যুদ্ধঝুঁকির ভাতা কিছু পেয়েছি। কিন্তু এখন আমার কাছে জীবনের নিরাপত্তাই সবার আগে।’
বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরীর ভাষ্য, ‘মেরিটাইম লেবার কনভেনশন অনুযায়ী যুদ্ধকালীন এলাকায় নাবিকদের প্রাণ ঝুঁকি থাকলে তারা নিজ খরচে প্রত্যাবাসন বা সাইন-অফের অধিকার রাখেন। এই ঝুঁকিপূর্ণ জোনে অবস্থানের জন্য তারা মূল বেতনের দ্বিগুণ (শতভাগ বোনাস) আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাবেন। সাইন-অফ বিলম্বিত হলে অতিরিক্ত মেয়াদের জন্য বর্ধিত হারে ওভারটাইম পাবেন। কম্পানি যদি তাদের জাহাজ থেকে নামতে না দেয়, তবে ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট ওয়াকার্স ফেডারেশন বা সেই দেশের পোর্ট স্টেট কন্ট্রোলকে অবহিত করে আইনি সুরক্ষা এবং পূর্ণ পাওনা আদায় করা সম্ভব।’
চুক্তির মেয়াদ শেষ হলেও নিজ উদ্যোগ জাহাজ থেকে নামতে পারার কারণ জানিয়েছেন আরেক নাবিক। তার ভাষ্য, ‘জাহাজ থেকে নিজ উদ্যোগে নামলে বাংলাদেশের সুনাম ক্ষুণ্ন হবে। বাংলাদেশি নাবিকদের জন্য আরব-আমিরাত ভিসা সুবিধা বন্ধ। তাই চাইলেও আমি আমিরাতের কোনো সমুদ্রবন্দরে নেমে ইমিগ্রেশন করতে পারব না। জাহাজ পরিচালনা কম্পানির বিশেষ সহায়তা লাগবেই।’
বিএসসি এখন জাহাজ থেকে নাবিকদের সাইন-অফ বা নামানোর কোন উদ্যোগ নিতে চাইছে না। তারা ইরানি বাহিনীর বিশেষ অনুমতি নিয়ে বাংলার জয়যাত্রা জাহাজের নাবিকসহ হরমুজ পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করছে।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার একাধিকবার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে জাহাজটি হরমুজ পাড়ি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। জাহাজের তথ্য সরবরাহ করেছিল ইরানের দূতাবাসকে। শেষ পর্যন্ত অনুমতি মেলেনি।
জাহাজটির ক্যাপ্টেন মো. শফিকুল ইসলাম নিজেই বলেছেন, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর চোখের সামনে মুহুর্মুহু মিসাইল হামলা, কখনো বিধ্বস্ত মিসাইলের ভাঙা অংশ পাশের জাহাজে পড়তেও দেখেছি। এমন ভয়ের পরিবেশ কখনো দেখিনি।



