গহিন অরণ্যের রোমাঞ্চকর জলপ্রপাত হামহাম

ছবি: আগামীর সময়
অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় পর্যটকদের জন্য মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের রাজকান্দি বনের গভীরে লুকিয়ে থাকা হামহাম জলপ্রপাত যেন এক রোমাঞ্চকর হাতছানি। পাহাড়, গহিন অরণ্য আর ঝিরিপথ পাড়ি দেওয়ার এই যাত্রা যেমন চ্যালেঞ্জিং, তেমনই তৃপ্তিদায়ক।
প্রকৃতির বুনো সৌন্দর্য আর রোমাঞ্চ যাদের রক্তে মিশে আছে, তাদের কাছে 'হামহাম' একটি স্বপ্নের নাম। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গভীরে অবস্থিত এই জলপ্রপাতটি বাংলাদেশের অন্যতম উঁচু এবং দুর্গম জলপ্রপাতগুলোর একটি। প্রায় ১৬০ ফুট উঁচু থেকে আছড়ে পড়া জলরাশির গর্জন আর চারপাশের আদিম নিস্তব্ধতা মিলে তৈরি করে এক মায়াবী পরিবেশ।
হামহাম যাওয়ার মূল রোমাঞ্চ শুরু হয় কুরমা বন বিটের কলাবন গ্রাম থেকে। এখান থেকেই শুরু হয় গহিন বনে প্রবেশের ট্র্যাকিং। পাহাড়ি উঁচু-নিচু পথ, কোথাও খাড়া ঢাল আর কোথাও পিচ্ছিল কাদা, সব মিলিয়ে এই যাত্রা একজন সত্যিকারের অ্যাডভেঞ্চার নেয় ধৈর্যের পরীক্ষা।
যাত্রার একপর্যায়ে আপনাকে পাড়ি দিতে হবে দীর্ঘ ঝিরিপথ। স্বচ্ছ শীতল পানির মধ্য দিয়ে পাথরের ওপর দিয়ে হাঁটার অভিজ্ঞতা হবে অবিস্মরণীয়। দুই পাশে আকাশচুম্বী গাছ, লতাগুল্ম আর নাম না জানা পাখির ডাক আপনাকে মনে করিয়ে দেবে আপনি প্রবেশ করছেন আধুনিক সভ্যতা থেকে অনেক দূরে প্রকৃতির এক আদিম রাজ্যে।
দীর্ঘ ২-৩ ঘণ্টার ক্লান্তিকর ট্র্যাকিং শেষে যখন কানে আসবে পানির পতনের তীব্র শব্দ, তখন সব ক্লান্তি হারিয়ে যাবে নিমেষেই। পাহাড়ের গা বেয়ে দুধসাদা জলরাশি যখন নিচে আছড়ে পড়ে, সেই দৃশ্যটি দেখার পর মনে হবে এই কষ্ট সার্থক। জলপ্রপাতের নিচে তৈরি হওয়া কুণ্ডে হিমশীতল পানিতে স্নান করা যেকোনো পর্যটকের জন্য জীবনের সেরা অভিজ্ঞতাগুলোর একটি।
বর্ষার শেষের দিকে (আগস্ট-অক্টোবর) হামহামের রূপ সবচেয়ে বেশি থাকে। তবে শীতে ট্র্যাকিং সহজ হলেও পানির প্রবাহ অনেক কমে যায়।
অবশ্যই গ্রিপ ভালো এমন জুতো বা প্লাস্টিকের স্যান্ডেল পরবেন। সঙ্গে বাঁশের লাঠি (ভারসাম্য রক্ষার জন্য), পর্যাপ্ত জল, শুকনো খাবার, গ্লুকোজ এবং জোঁকের হাত থেকে বাঁচতে লবণ বা সরিষার তেল রাখবেন।
জঙ্গল অত্যন্ত গভীর এবং গোলকধাঁধার মতো, তাই কলাবন গ্রাম থেকে অবশ্যই একজন স্থানীয় গাইড নেবেন সঙ্গে।
শহুরে যান্ত্রিকতা ছেড়ে যারা একটু বুনো অ্যাডভেঞ্চারের খোঁজে আছেন, তাদের জন্য হামহাম জলপ্রপাত হতে পারে সেরা গন্তব্য। পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে লুকিয়ে থাকা এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে আপনাকে হতে হবে ধৈর্যশীল এবং সাহসী। তবেই আপনি খুঁজে পাবেন বাংলার প্রকৃতির এক অদেখা স্বর্গ হামহাম জলপ্রপাত।
যেভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে বাস বা ট্রেনে প্রথমে কমলগঞ্জের ভানুগাছ রেলওয়ে স্টেশন পৌঁছাতে হবে। ভানুগাছ রেলওয়ে স্টেশন থেকে জিপ (চাঁদের গাড়ি) বা সিএনজি রিজার্ভ করে কুরমা বন বিটের কলাবন গ্রাম পর্যন্ত যেতে হবে। এটাই ট্র্যাকিংয়ের শুরুর পয়েন্ট।
যারা বাসে ঢাকা থেকে শ্রীমঙ্গল আসবেন তারা জিপ (চাঁদের গাড়ি) বা সিএনজি রিজার্ভ করে কুরমা বন বিটের কলাবন গ্রাম পর্যন্ত যেতে হবে।
কলাবন গ্রাম থেকে অবশ্যই একজন স্থানীয় গাইড সঙ্গে নিতে হবে (খরচ প্রায় ৫০০-৮০০ টাকা)। গাইড ছাড়া গভীর বনে পথ হারানোর সম্ভাবনা থাকে প্রবল।


