প্লাবন ভূমিতে মাছ উৎপাদনে দাউদকান্দি সেরা

সংগৃহীত ছবি
কুমিল্লা জেলার মাছ উৎপাদনের প্রধান ভিত্তি এখন দাউদকান্দির প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষ। এই পদ্ধতিই জেলার চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, এমনকি বিদেশেও মাছ সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। একসময় দেশসেরা মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া দাউদকান্দির এই প্লাবন ভূমি মাছ চাষ এখনো তার অবস্থান ধরে রেখেছে।
জেলা ও উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মাছ উৎপাদনে কুমিল্লা জেলা দেশে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে। তবে প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষে কুমিল্লা দেশসেরা, আর জেলার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে দাউদকান্দি উপজেলা। জেলার মোট উৎপাদিত মাছের অর্ধেকেরও বেশি আসে এ উপজেলার প্লাবন ভূমি থেকে।
চলতি মৌসুমে বর্ষা শুরুর আগেই উপজেলার ইলিয়টগঞ্জ, আদমপুর, পুটিয়া ও রায়পুর এলাকায় প্রায় ১১৫টি প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। কিছু প্রকল্পে এরই মধ্যে মাছ আহরণ ও বাজারজাতও শুরু হয়েছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে দাউদকান্দিতে প্লাবন ভূমিতে মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ২ লাখ ৮৪ হাজার টন। এর মধ্যে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার টন, যা কুমিল্লা জেলার মধ্যে সর্বোচ্চ। অন্যদিকে তিতাস উপজেলায় উৎপাদন ছিল সর্বনিম্ন।
এ অঞ্চলে চাষ করা মাছের মধ্যে রয়েছে তেলাপিয়া, পাঙাশ, রুই, কাতলা, মৃগেল, পুঁটি, সিলভার কার্প, কৈ, মাগুরসহ বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতি।
দাউদকান্দিতে প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষের সূচনা হয় ১৯৮৬ সালে। উপজেলার ধনুরখোলা গ্রামের সুনীল কুমার রায় প্রথম এ উদ্যোগ নেন। পরে ধীরে ধীরে এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনুসরণযোগ্য মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দাউদকান্দির পাশাপাশি কুমিল্লার মেঘনা, হোমনা, মুরাদনগর ও তিতাস উপজেলায়ও প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষ বিস্তৃত হয়েছে। এসব এলাকার লক্ষাধিক পরিবার এই খাতের ওপর নির্ভরশীল।
স্থানীয়দের মতে, একসময় খাল-বিল ও জলাশয়ে প্রচুর মাছ পাওয়া গেলেও বর্তমানে তা কমে গেছে। এ পরিস্থিতিতে শিক্ষিত তরুণরা মাছ চাষে এগিয়ে এসে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছেন। ফলে বেকারত্ব কমার পাশাপাশি অনেক পরিবার হয়েছে স্বাবলম্বী।
জেলার চারবারের সেরা মৎস্যচাষি আলী আহম্মেদ মিয়াজী বলেছেন, ‘প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষের কারণে দাউদকান্দি ও আশপাশের চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান বদলে গেছে। এখন অনেক শিক্ষিত তরুণ এই পেশায় যুক্ত হচ্ছেন।’
দাউদকান্দি উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সাবিনা ইয়াছমিন চৌধুরী জানান, উপজেলার প্রায় তিন হাজার হেক্টর প্লাবন ভূমিতে মাছের চাষ করা হচ্ছে। উৎপাদন বাড়াতে মৎস্য বিভাগ চাষিদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দিচ্ছে।
পরিবেশবিদ ও অধ্যাপক মতিন সৈকত বলেছেন, দাউদকান্দির প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষ এরই মধ্যে জাতীয় পর্যায়ে মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মৎস্য কর্মকর্তারা এখানে পরিদর্শনে আসেন। তবে এখানে এখনো মাছ সংরক্ষণের জন্য আধুনিক হিমাগার নেই।
মৎস্যচাষিরা জানান, সহজ শর্তে ব্যাংকঋণ এবং উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা না থাকায় তারা অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন ও লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। হিমাগার স্থাপন ও সহজ ঋণসুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এ অঞ্চলের মাছ চাষ আরও বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হবে।



