১২ লাখে মিলল ক্ষুধা, মরদেহ সাগরে

ছবি: ভিডিও থেকে নেয়া
স্বপ্ন ছিল গ্রিসে গিয়ে দিন-রাত কাজ করবেন। খরচ পাঠাবেন গ্রামে, পরিবারে আসবে সুদিন। সেই স্বপ্নযাাত্রা পরিণত হয়েছে অন্তিমযাত্রায়। ক্ষুধায়-তৃষ্ণায় নৌকায় প্রাণ হারালেন টগবগে যুবকরা। দেহ ভাসল ভূমধ্যসাগরে।
লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশে সাগরপাড়ি দিচ্ছিল অভিবাসনপ্রত্যাশীদের বহনকারী একটি নৌকা। শনিবার সেই নৌকায় থাকা ২২ জনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছে গ্রিসের কোস্টগার্ড কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে অন্তত ১০ যুবক বাংলাদেশি। তাদের বাড়ি সুনামগঞ্জে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১২ থেকে ১৩ লাখ টাকার বিনিময়ে দালালদের মাধ্যমে গ্রিসে যাচ্ছিলেন তারা। নৌকায় খাবার ও পানির অভাবে হয়েছে মৃত্যু তাদের।
স্থানীয়রা বলেছেন, দালালদের মাধ্যমে তিন থেকে চার মাস আগে গ্রিসের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন এই যুবকরা। সুদিনের আশায় জমিজমা বিক্রি করে ছেলেকে দালালের হাতে তুলে দিয়েছিল পরিবারগুলো। এখন সব হারিয়ে পাগলপ্রায় স্বজনরা।
জেলা পুলিশ, স্বজন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের তথ্য- শনিবারের ওই ঘটনায় মৃতদের মধ্যে আছেন জগন্নাথপুর উপজেলার পাঁচজন, দিরাই উপজেলায় চারজন এবং দোয়ারাবাজার উপজেলার একজন। পুলিশ এই জেলার আরও দুজনের মৃত্যুর কথা শুনলেও তা এখনো নিশ্চিত করেনি।
মৃত যুবকরা হলেন, জগন্নাথপুরের পাইলগাঁও ইউনিয়নের পাইলগাঁও গ্রামের আমিনুর রহমান (৩৫), একই উপজেলার রাণীগঞ্জ ইউনিয়নের টিয়ারগাঁও গ্রামের শায়ক আহমদ (২০) ও ইছগাঁও গ্রামের মোহাম্মদ আলী (৩০) এবং চিলাউড়া গ্রামের মো. নাঈম আহমদ ও মো. মনির। দিরাইয়ের কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের শাহিন মিয়া (২৫), নূরুজ্জামান সরদার ময়না (৩০) ও সাজিদুর রহমান (২৮), চরনারচর ইউনিয়নের ররনারচর গ্রামের বাসিন্দা ও উপজেলা যুবদলের সদস্য মজিবুর রহমানও (৩৭) মারা গেছেন এ ঘটনায়। আর দোয়ারবাজার উপজেলার দোহালিয়া ইউনিয়নের কবীরনগর গ্রামের আবু ফাহিম নামে আরেক যুবকের মৃত্যু রবিবার নিশ্চিত করেছে জেলা পুলিশ।
‘আমার ইউনিয়নের নাঈম আহমদ ও মনির মিয়া লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে সাগরে মারা গেছে। আমাদের উপজেলার আরও তিনজন মারা গেছে। প্রশাসন তাদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলছে’- তথ্য জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম বকুলের। গ্রিসে যেতে প্রত্যেকে ১২-১৩ লাখ টাকা করে দালালদের দিয়েছিলেন বলে দাবি তার।
‘নৌকায় খাবার-পানি না পেয়ে তারা মারা গেছে। মরদেহ পরে সাগরে ভাসিয়ে দিয়েছে’- জানালেন চেয়ারম্যান বকুল।
‘দালালরা সহজ-সরল মানুষদের প্ররোচিত করে সর্বস্ব বিক্রি করে টাকা নিয়েছে। এখন পথে তাদের সন্তানদেরও মেরে ফেলেছে’- ক্ষোভ চেয়ারম্যানের।
দিরাইয়ের তারাপাশা গ্রামের উমেদ আলী এ ঘটনায় হারিয়েছেন তার ভাগ্নেকে। ‘আমরা আমাদেরই এলাকার এক দালালের মাধ্যমে ১২ লাখ টাকায় চুক্তি করেছিলাম। বেশিরভাগ টাকাই লিবিয়া নেওয়ার পর নিয়ে গেছে। এখন পরিবারটি নিঃস্ব। তাদের সন্তানও চিরদিনের জন্য হারিয়েছে।’
‘তাদেরকে উপাস রাইখা মারছে ওরা (দালালরা)’- বিলাপ করছিলেন আরেক স্বজন। পরিবারগুলোর এখন একটাই দাবি, বিচার করতে হবে সেই দালালদের।
‘প্রথমে দিরাই ও জগন্নাথপুরের ৯ জনের মৃত্যুর খবর পেয়েছি। পরে জানলাম দোয়ারাবাজারের একজন মারা গেছে। আরও দুইজনের খবর শুনেছি, তবে এখনো নিশ্চিত নই’- বললেন পুলিশ পরিদর্শক মো. আজিজুর রহমান। মৃতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে অভিযোগ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানালেন তিনি।

