মেহেরপুরে দাঁতের চিকিৎসায় হাতুড়েদের দাপট
- নিবন্ধিত মাত্র ৪, অননুমোদিত ৯৩

মেহেরপুরে অনুমোদন ছাড়াই প্রাইভেট চেম্বার খুলে দে;ওয়া হচ্ছে দাঁতের চিকিৎসা। ছবি: আগামীর সময়
‘দাঁত থাকতে দাঁতের মর্ম বুঝে না’ প্রচলিত এই প্রবাদ এখন আর কেবল ব্যক্তিগত অবহেলার গল্প নয়। এটি যেন জনস্বাস্থ্যের এক নীরব সংকটের প্রতিচ্ছবি। দাঁতের যত্নে উদাসীনতা, সচেতনতার ঘাটতি এবং দক্ষ চিকিৎসকের অভাবে সাধারণ মানুষ ঝুঁকছেন হাতুড়ে চিকিৎসকদের দিকে। আর সেখান থেকেই জন্ম নিচ্ছে নতুন বিপদ। ভুল চিকিৎসা, সংক্রমণ, এমনকি দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা।
দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো মেহেরপুর জেলাতেও দাঁতের চিকিৎসা খাতে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার চিত্র উদ্বেগজনক। দক্ষ চিকিৎসকরে অভাবে রোগীরা বাধ্য হয়ে শরণাপন্ন হচ্ছেন হাতুড়ে চিকিৎসকদের। ফলে কেউ দাঁতে দাঁত চেপে যন্ত্রণা সহ্য করছেন। আবার কেউ ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে ভুগছেন স্থায়ী ক্ষতিতে। অথচ এই পরিস্থিতিতে কার্যকর প্রশাসনিক তদারকি নেই বললেই চলে।
জানা গেছে, মেহেরপুর জেলায় বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) নিবন্ধিত দন্ত চিকিৎসক মাত্র মাত্র চারজন। অথচ এই জেলায় প্রকাশ্যে দাঁতের চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন ৯৩ জন অনিবন্ধিত ব্যক্তি। তারা দাঁত তোলা থেকে শুরু করে ঝুঁকিপূর্ণ রুট ক্যানেল, এমনকি মাইক্রো সার্জারির মতো জটিল চিকিৎসাও করছেন। এতে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
জেলায় একটি ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশন থাকলেও তার সভাপতিরই নেই বিএমডিসি সনদ, নেই বিডিএস ডিগ্রি বা স্বীকৃত ডিপ্লোমাও
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মেহেরপুর সদর উপজেলায় ২১টি ডেন্টাল কেয়ারের সাইনবোর্ডের অধীনে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন মোট ২৫ জন। যাদের মধ্যে মাত্র তিনজনের বিএমডিসি সনদ রয়েছে। গাংনী উপজেলায় ১২টি এবং মুজিবনগর উপজেলায় ৫টি ডেন্টাল কেয়ার সেন্টার থাকলেও সেখানে কর্মরত কোনো চিকিৎসকেরই বিএমডিসি নিবন্ধন নেই। এর বাইরেও গ্রামাঞ্চলে সাইনবোর্ডবিহীনভাবে দাঁতের চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন আরও কিছু ব্যক্তি।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, জেলায় একটি ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশন থাকলেও তার সভাপতিরই নেই বিএমডিসি সনদ, নেই বিডিএস ডিগ্রি বা স্বীকৃত ডিপ্লোমাও। এই অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সংখ্যা ৩৫ জন। তারা কেবল একটি ট্রেড লাইসেন্স এবং বিডিএস চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলার দাবি করে চালিয়ে যাচ্ছেন চিকিৎসা কার্যক্রম। নিজেরাই দিচ্ছেন অ্যানেস্থেসিয়া, প্রেসক্রিপশনে লিখছেন অ্যান্টিবায়োটিক।
বিএমডিসি নিবন্ধিত দন্ত চিকিৎসক মাত্র মাত্র চারজন। অথচ এই জেলায় প্রকাশ্যে দাঁতের চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন ৯৩ জন অনিবন্ধিত ব্যক্তি
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মেহেরপুর জেলার এক বিডিএস সার্জন আগামীর সময়কে বরেছেন, এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত চিকিৎসা কার্যক্রমের ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি বহুগুণে বাড়ছে। অপরিষ্কার যন্ত্রপাতি ব্যবহারের কারণে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে হেপাটাইটিসসহ বিভিন্ন রক্তবাহিত রোগ। একইসঙ্গে ভুল চিকিৎসার কারণে স্থায়ী স্নায়ু ক্ষতি, মুখমণ্ডলের বিকৃতি এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যথার মতো জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেন বলে জানিয়েছেন মেহেরপুরের সিভিল সার্জন ডা. এ কে এম আবু সাঈদ।
তিনি আগামীর সময়কে বলেছেন, প্রাইভেট চেম্বারের বিষয়গুলো সরাসরি তদারকি করেন না তারা। তবে কেউ অভিযোগ করলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান।
সিভিল সার্জন ডা. এ কে এম আবু সাঈদ আরও বলেছেন, ম্যাজিস্ট্রেট ক্ষমতা না থাকায় নিজেরা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারেন না। কেবল পরিদর্শন ও পরামর্শ দিতে পারেন।
মেহেরপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাজওয়ার আকরাম সাকাপি ইবনে সাজ্জাদ বলেছেন, জেলায় অননুমোদিত দন্ত চিকিৎসা কার্যক্রমের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। কেউ অভিযোগ জানালে বা তথ্য দিলে, বিএমডিসি নিবন্ধন ছাড়া চিকিৎসা প্রদানকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে অভিযান চালানো হবে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে।
তিনি আরও যোগ করেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কঠোর অবস্থানে রয়েছে জেলা প্রশাসন। এ ধরনের অনিয়ম বন্ধে জোরদার করা হবে নিয়মিত তদারকি।





