পকেট ভরা টাকায়ও মেলে না পেট ভরার সবজি
- জ্বালানির দাম বাড়া দিয়ে বাজারে উত্তাপের শুরু
- একে একে বেড়েছে পরিবহন ভাড়া ও নিত্যপণ্যের দাম
- কাঁচাবাজারে রীতিমতো লেগেছে আগুন
- বাজারের অস্থিরতার ছাপ মূল্যস্ফীতিতেও
- টানাটানির সংসার খরচায় টান পড়েছে আরও

সংগৃহীত ছবি
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের অভিঘাত বিশ্ব জুড়ে। সেই অভিঘাতের আঘাত লেগেছে বাঙালির ভাতের থালায়ও। প্রথমে জ্বালানির দাম বাড়া দিয়ে শুরু। এরপর সেই অজুহাতে একে একে বেড়েছে পরিবহন ভাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা জিনিসের দাম। আর কাঁচাবাজারে রীতিমতো লেগেছে আগুন। গত ফেব্রুয়ারির শেষদিক থেকে শুরু হওয়া সেই অস্থিরতার ছাপ পড়েছে মূল্যস্ফীতিতেও। মার্চ মাসের তুলনায় এপ্রিলে বেড়েছে মূল্যস্ফীতি। ফলে কম আয়ের মানুষের টানাটানির সংসার খরচায় টান পড়েছে আরও। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, অনেকের বাজারে গিয়ে দাম শোনার পর প্রতিটি সবজিকেই মনে হচ্ছে একেকটা গোলা!
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) গত বুধবার জানিয়েছে, দেশে এপ্রিলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে; যা গত মার্চে ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত— উভয় খাতই ভূমিকা রেখেছে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিতে। তবে মূল ভূমিকায় ছিল খাদ্যবহির্ভূত খাত। নিত্যপণ্যের দামের ওপর চাপ অব্যাহত থাকায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি এপ্রিলে কিছুটা বেড়ে পৌঁছেছে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশে। এক মাস আগে যা ছিল ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ।
অন্যদিকে, খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি আরও বেশি বেড়ে এপ্রিলে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশে, যা মার্চে ছিল ৯ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ।
এ উর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি বার্তা দিচ্ছে জ্বালানি ও পরিবহনসহ বিভিন্ন সেবার ব্যয়ের ধারাবাহিক বৃদ্ধির। গতকাল বৃহস্পতিবার কাঁচাবাজারে দেখা গেল সেই প্রবণতা। বাজারে সব সবজির দামই বেড়েছে ৫ থেকে ১০ টাকা করে। বেড়েছে ডিম, ভোজ্য তেলের দামও। চালের বাজারও বাড়তি।
সপ্তাহখানেক আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৭৬ থেকে ৪ টাকা বাড়িয়ে ১৮০ এবং খোলা পাম অয়েলের দর ১৬৬ টাকা অপরিবর্তিত রাখে। তবে বাজারে এ দরে খোলা ভোজ্য তেল পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন ১৯৪-১৯৫ এবং পাম অয়েল কমবেশি ১৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
হাতিরপুল কাঁচাবাজার ও কারওয়ান বাজারে ঘুরে দেখা যায়, প্রায় সব ধরনের সবজি ৮০-১০০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। হাতিরপুল বাজারে ২০ ধরনের সবজির মধ্যে ঢেঁড়স ও মিষ্টিকুমড়া বাদে সব সবজি ৮০-১০০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে আবার বরবটি, কাঁকরোল ও বেগুনের কেজি ১২০ টাকা। করলা, পটোল, টমেটো, গাজর, লাউ, উচ্ছে, চিচিঙ্গা, মুলা, লতি মিলছে ৮০-৯০ টাকায়। ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রাম ওজনের প্রতি পিস ফুলকপি বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায়। পেঁপের কেজি ৮০ টাকা।
শসার কেজি ঠেকেছে ১২০ থেকে ১৩০ টাকায়। মিষ্টিকুমড়া ৪০-৫০, আলু ২০-২৫ ও ঢেঁড়সের কেজি ৭০ টাকা। বড় সাইজের এক হালি লেবুতে লাগছে ৪০ টাকা।
ব্যবসায়ীদের দাবি, সাম্প্রতিক বৃষ্টির কারণে বাজারে দেখা দিয়েছে সরবরাহ ঘাটতি, যে কারণে বাড়ছে দামও। হাতিরপুল বাজারের দোকানি ওমর ফারুকের যুক্তি, ‘বৃষ্টির কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটেছে। আবার তেলের দাম বাড়ায় বেড়েছে গাড়ির ভাড়া। জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে হুহু করে। যারা রেগুলার কাস্টমার তারাও দাম বেশি শুনলে অন্য দোকানে চলে যাচ্ছে। কিন্তু যখন অন্য দোকানেও দেখে একই দাম, তখন আবার ফিরে আসছে।’
অবশ্য, ক্রেতারা বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ। সবজির দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারাকে তারা বলছেন সরকারের ব্যর্থতা।
রায়হান আবির নামে এক ক্রেতা আগামীর সময়ের কাছে প্রকাশ করলেন ক্ষোভ আর হতাশা, ‘যেভাবে আস্তে আস্তে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, এভাবে বাড়তে থাকলে জীবন টেনে নেওয়াই কষ্ট হয়ে যাবে।’
এমন পরিস্থিতিতে বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কঠোর মনিটরিং ও নিয়মিত অভিযানের দাবি এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। বাজারের এ অস্থিতিশীল পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষণা সংস্থা সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হানের মতে, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিতে ভূমিকা রেখেছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন, উৎপাদন, সেচ, সংরক্ষণ ও বিতরণ খরচ বেড়ে যায়, যা দামে প্রভাব ফেলে।
সেলিম রায়হান একটি সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, এপ্রিলের মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি শুধু জ্বালানির দাম বৃদ্ধি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। সরবরাহ ব্যবস্থায় অদক্ষতা, বিনিময় হারের চাপ, আমদানি ব্যয়, বাজার আচরণ এবং মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।



