পীরের আদেশে যে এলাকার নারীরা ভোট দেন না ৫৬ বছর ধরে

সংগৃহীত ছবি
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র কয়েক দিন। ১২ ফেব্রুয়ারি দিনব্যাপী জনগণ ভোটের মাধ্যমে তাদের পছন্দের ব্যক্তিকে নির্বাচিত করবেন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দল ও প্রার্থীদের জন্য ভোট হচ্ছে ক্ষমতায় যাওয়ার শক্তিশালী মাধ্যম। যদিও অনেক ভোটারের কাছে ভোটের গুরুত্ব তেমন একটা নেই।
তবে সাধারণভাবে এলাকার উন্নয়ন ও কাজ-কর্ম যার দ্বারা বেশি হবে বলে মনে করেন, ভোটাররা তাকেই ভোট দিয়ে থাকেন। ইসলামের দৃষ্টিতে ভোটের গুরুত্ব অপরিসীম। ভোটের দায়বদ্ধতার বিষয়ে কিয়ামতের দিন প্রত্যেককেই জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে।
এ প্রসঙ্গে এক হাদিসে এসেছে, হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘সাবধান! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই (কেয়ামতের দিন) তার দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। (সহিহ বোখারি ও মুসলিম)
ভোট প্রদানে বাংলাদেশের প্রখ্যাত ইসলামিক স্কলারগণ এর গুরুত্ব বর্ণনা করলেও উল্টো চিত্র চাঁদপুরে এক পীরের।
জানা যায়,চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের নারীরা বাজারে যাওয়া, কেনাকাটা, চাকরি-বাকরি, পড়াশোনাসহ সব কাজ করেন। কেবল তারা গত ৫৬ বছর ধরে ভোটকেন্দ্রে যান না।
আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে এ এলাকাটি। প্রতিবারের মতো এবারও তাদের ভোটকেন্দ্রে আনতে প্রশাসন জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। দেশজুড়ে ভোটকেন্দ্র মানে নারী-পুরুষের লম্বা সারি। সেখানে এই ইউনিয়নের ভোটকেন্দ্র মানে পুরুষদের উপস্থিতি। নারীরা কোনো জাতীয় বা স্থানীয় নির্বাচনে ভোট দেননি।
কথিত আছে, ১৯৬৯ সালে ভারতের জয়নপুর থেকে পীর মওদুদ হাসান জয়নপুরী (রহ.) এখানে আসেন। সেই সময় দেশে কলেরা মহামারি ছিল। ওই প্রেক্ষাপটে পীর সাহেব নাকি নারীদের পর্দা রক্ষা ও ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার নির্দেশ দেন। যদিও এ তথ্যের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তবে মহামারি বহু আগে শেষ হলেও তাঁর সেই নির্দেশ সামাজিক রীতিতে এলাকার সবার কাছে
পরিণত হয়েছে। ভোট সম্পর্কে নারীরা জানান, ভোট না দেওয়ার বিষয়টি তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত ছিল না। পারিবারিক চাপ, পীরের কথা অবমাননা বা ক্ষতির আশঙ্কায় তারা ভোটকেন্দ্রে যেতেন না।
ভোট নিয়ে অনেক নারী নারী জানান, ভোটের দিন তারা ঘরে থাকেন। তাছাড়া , পুরুষরা খুব একটা জোর দেন না। আবার কেউ অনুরোধ করলেও অনেকে নিজের ইচ্ছায় ভোট দেন না। কারণ, ওই পীরের আদেশ অমান্য করলে যদি কোনো অনিষ্ট হয়। নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেল, রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের মোট ভোটার ২১ হাজার ৬৯৫ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ১০ হাজার ২৯৯ জন। স্থানীয় নির্বাচনে সংরক্ষিত ওয়ার্ডের সদস্য এবং উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন পুরুষদের ভোটে।
এ বিষয়ে সংরক্ষিত সদস্য হাজেরা বেগম বলেন, সময় বদলেছে। এখন নারীরা আগের চেয়ে সচেতন। অনেক নারী ভোট দেওয়ার কথা বলছেন। আমিও চাই, নারীরা অধিকার প্রয়োগ করুক। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নারীদের ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করছেন জেলা প্রশাসক ও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. নাজমুল ইসলাম সরকার। সভা-সমাবেশ করেছেন। গত বুধবার রূপসা ইউনিয়নের সাহেবগঞ্জ এলাকায় নারীদের ভোটদানে উদ্বুদ্ধকরণে ইমাম-মুয়াজ্জিনদের নিয়ে সভা করেন।
ওই সভায় জেলা প্রশাসক বলেন, ইসলামের দৃষ্টিতে পর্দা মেনে ভোট দেওয়া নিষিদ্ধ বা অপরাধ নয়। চাঁদপুর-৪ আসনে এবারের নির্বাচনে ছয় প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে বিএনপি প্রার্থী মো. হারুনুর রশীদ বলেন, ভোট দেওয়া সাংবিধানিক অধিকার।
নারীরা কেন্দ্রে এলে গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হবে। আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলছি, আস্থা তৈরির চেষ্টা করছি। জামায়াতের প্রার্থী বিল্লাল হোসেন মিয়াজী বলেন, ইসলামে নারীদের ভোট দেওয়া নাজায়েজ বা নিষিদ্ধ এমন কোনো কথা নেই। নারীদের কেন্দ্রে আনতে জামায়াত জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। ইতোমধ্যে দলের নারী কর্মীরা এলাকায় গিয়ে ৮-১০টি উঠান বৈঠক করেছেন।

