যুক্তরাষ্ট্র কি পারবে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জব্দ করতে, ঝুঁকি কী কী?

স্যাটেলাইট চিত্রে ইরানের ইসফাহান পারমাণবিক কেন্দ্রে আগে ধ্বংস হওয়া একটি ভবনের ওপর নতুন ছাদ দেখা যাচ্ছে। ছবি : রয়টার্স
ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে হামলার এক মাস পূর্তিতে হোয়াইট হাউস থেকে বুধবার প্রায় ২০ মিনিটের ভাষণ দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যেখানে তিনি ইরানের কাছে থাকা পারমাণবিক অস্ত্রের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়ামের মজুদ জব্দ করার কথা জানান।
কাজটির জন্য ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিতে মার্কিন বিশেষ বাহিনী পাঠানোর কথা বিবেচনা করছেন বলেও উল্লেখ করেছেন। যুদ্ধাবস্থায় ট্রাম্প যদি কাজটি করতে চান, তাহলে এটি একটি জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক অভিযান হবে বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
গত এক বছর ধরে ইরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার সময় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল, ইরানের কোনো পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না কিংবা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে তা উৎপাদনের সক্ষমতাও থাকবে না। এই যুক্তিতেই গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের শেষ সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে বোমা হামলা চালায়। চলতি ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে তেহরান আক্রমণ শুরুর ক্ষেত্রেও ওয়াশিংটন একই যুক্তিটি ব্যবহার করে, যদিও সে সময় দেশটির সঙ্গে তাদের সক্রিয় আলোচনা চলছিল।
ইরান অবশ্য দাবি করেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শুধু বেসামরিক জ্বালানির জন্য পরিচালিত হয়, যদিও তারা প্রয়োজনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে। দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা কমানোর বিষয়ে আলোচনা করতে ইচ্ছুক হলেও পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ অসম্ভব। তাদের ভাষ্য, এটি তাদের জাতীয় সার্বভৌমত্বের বিষয়।
ওবামা প্রশাসন ২০১৫ সালে ইরান ও অন্য দেশগুলোর সঙ্গে একটি যৌথ কর্মপরিকল্পনা (জেসিপিওএ) নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। এর কারণে ইরান উচ্চমাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ না করতে এবং ঘন ঘন কেন্দ্রগুলো পরিদর্শনের অধীন থাকতে সম্মত হয়েছিল। তবে ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে এসে চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেন।
ইরানের কাছে কী পরিমাণ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আছে এবং তা কোথায়?
বর্তমানে ইরানের কাছে প্রায় ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ৪৪০ কেজি (৯৭০ পাউন্ড) ইউরেনিয়াম রয়েছে বলে মনে করা হয়। এই পর্যায়ে পৌঁছালে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ৯০ শতাংশের সীমায় পৌঁছানো অনেক দ্রুততর হয়।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রধান রাফায়েল গ্রোসি মার্চের শুরুতে আলজাজিরাকে জানিয়েছিলেন, তাত্ত্বিকভাবে এই পরিমাণ ইউরেনিয়াম দিয়ে ১০টিরও বেশি পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরি করা সম্ভব।
ওই সময় গ্রোসি ধারণা করেছিলেন, ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের প্রায় অর্ধেক সম্ভবত এখনো ইরানের ইসফাহান পারমাণবিককেন্দ্রের টানেল কমপ্লেক্সে মজুদ রয়েছে। নাতাঞ্জকেন্দ্রেও একটি কিছু পরিমাণ মজুদ আছে।
এই দুটি ভূগর্ভস্থ পারমাণবিককেন্দ্রের পাশাপাশি ফোরডোতে অবস্থিত তৃতীয় কেন্দ্রটিতে গত বছর মার্কিন বাহিনী বিমান হামলা চালায়। হামলায় এগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বর্তমান যুদ্ধেও এগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কোথায় আছে তা জানলেও যুক্তরাষ্ট্রকে সেটি উত্তোলন করার জন্য বেশ কঠিন সামরিক স্থল অভিযানের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক্ষেত্রে মার্কিন বাহিনীকে উল্লেখযোগ্য রাসায়নিক, সরবরাহগত এবং কৌশলগত বাধার সম্মুখীন হতে হবে।
মার্কিন বাহিনী কীভাবে ইউরেনিয়াম সংগ্রহ করবে?
ইরানের প্রায় অর্ধেক সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ থাকা ইসফাহান উপকূল থেকে ৪৮০ কিলোমিটারেরও বেশি ভেতরে অবস্থিত এবং নিকটতম মার্কিন নৌ-জাহাজগুলো থেকে কয়েকশ কিলোমিটার দূরে।
এর অর্থ দাঁড়ায়, ইসরায়েলি সৈন্যদের সঙ্গে নিলেও একটি সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে অনেক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে মার্কিন বাহিনীকে। শুধু তাই নয়, ইউরেনিয়াম তুলতে খননযন্ত্রসহ ভারী সরঞ্জামও সঙ্গে নিয়ে সুড়ঙ্গে প্রবেশ করতে হবে।
সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলো থেকে পারমাণবিক উপাদান খনন করে বের করার অভিযানটি যতক্ষণ চলবে, ততক্ষণ সেই এলাকাটি ধরে রাখতে হবে। এজন্য অবশ্যই স্থলবাহিনীকে এলাকাটির চারপাশে একটি শক্তিশালী নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে হবে।
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো জেসন ক্যাম্পবেল মত দেন, ইরানের প্রায় অবিরাম গোলাবর্ষণ থেকে নিরাপদ থেকে স্থলবাহিনীর জন্য কাজটি শুধু ঝুঁকিপূর্ণ নয়, প্রায় অসম্ভব।
ওবামা ও ট্রাম্প প্রশাসনে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ঊর্ধ্বতন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ক্যাম্পবেল আরও স্বীকার করেছেন, এখন পর্যন্ত কোনো ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাকে এসব পরিকল্পনার পদক্ষেপ নিতে আমি দেখছি না।
ইউরেনিয়াম উত্তোলন করা গেলেও মার্কিন বাহিনী কি যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যেতে পারবে ?
ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সম্ভবত হেক্সাফ্লুরাইড গ্যাস আকারে সংরক্ষণ করা হচ্ছে বলে অনুমান লস অ্যালামোস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির সাবেক রেডিওকেমিস্ট শেরিল রোফার।
তিনি মত দেন, এই গ্যাসটি পরিচালনা করা কঠিন এবং এটি পানির সঙ্গে বিক্রিয়া করে অত্যন্ত বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করে। ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লুরাইডকে অবশ্যই ছোট ও পৃথক ক্যানিস্টারে সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে নিউট্রনগুলো অনিয়ন্ত্রিতভাবে সংখ্যাবৃদ্ধি করে তীব্র তেজস্ক্রিয়তার বিস্ফোরণ ঘটাতে না পারে।
এর অর্থ দাঁড়ায়, সিলিন্ডারগুলোকে একে অপরের থেকে দূরে রাখতে হবে। বিমান হামলা বা তাড়াহুড়া করে পরিবহনের সময় কোনো দুর্ঘটনা হলে সেগুলোর বিষাক্ত রাসায়নিকের কারণে কাছাকাছি থাকা কর্মীদের জন্য তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি তৈরি করবে।
মার্কিন প্রভাবশালী সাময়িকী ‘বুলেটিন অফ দ্য অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টস’-এর পারমাণুবিষয়ক সম্পাদক ফ্রাঁসোয়া দিয়াজ মরিন ব্যাখ্যা করেন, পরিবহন করার পরিবর্তে সিলিন্ডারগুলো ঘটনাস্থলেই ধ্বংস করা কঠিন হলেও, অসম্ভব নয়।
তিনি জানান, মার্কিন সেনাবাহিনীতে আর্মি নিউক্লিয়ার ডিসেবলমেন্ট টিম নামে তিনটি বিশেষ ইউনিট রয়েছে। যাদের পারমাণবিক সরঞ্জাম ও উপকরণ নিষ্ক্রিয় এবং ধ্বংস করার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
দিয়াজ মরিন আশঙ্কা প্রকাশ করেন, মজুদটি বিস্ফোরিত হলে বিষাক্ত ইউরেনাইল ফ্লোরাইড তাৎক্ষণিক পরিবেশকে রাসায়নিকভাবে দূষিত করবে, যা একটি দীর্ঘস্থায়ী পরিবেশগত বিপদ সৃষ্টি করবে। সব সিলিন্ডার ধ্বংস হয়েছে কিনা তা নির্ধারণ করাও কঠিন।
এর ফলে এই ঝুঁকি থেকে যায়, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য যথেষ্ট পরিমাণ সিলিন্ডার সংগ্রহ করে ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের জার্মান মার্শাল ফান্ডের একজন বিশিষ্ট ফেলো ইয়ান লেসার স্পষ্ট করেন, কাজটি কয়েকটি হেলিকপ্টার আর কয়েক ঘণ্টার বিষয় নয়; এটি অনেক বেশি জটিল।
তিনি সতর্ক করেন, বিষয়টি সম্পূর্ণ সফলভাবে শেষ করতে না ইরানি কর্তৃপক্ষ পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যেতে ব্যাপক উৎসাহ পাবে।
ইয়ান লেসারের মত, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে আসা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে অনেক কম ঝুঁকিপূর্ণ একটি পথ। চুক্তির মাধ্যমে মজুদ ইউরেনিয়াম একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার তত্ত্বাবধানে রেখে দেওয়া যেতে পারে অথবা সমৃদ্ধকরণের মাত্রা কমিয়ে দেওয়া সম্ভব।
এর আগে কি এমন কোনো অভিযান চালানো হয়েছে?
১৯৯৪ সালে মার্কিন বাহিনী প্রজেক্ট স্যাফায়ার নামে একটি অভিযানের মাধ্যমে কাজাখস্তান থেকে প্রায় ৬০০ কেজি অস্ত্র বানাতে সক্ষম ইউরেনিয়াম বিমানে করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসে ।
সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর রয়ে যাওয়া পারমাণবিক উপাদান অপসারণের জন্য কাজাখ কর্তৃপক্ষ এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) সঙ্গে সমন্বয় করে অভিযানটি সম্পন্ন করা হয়।
যদিও এটি অত্যন্ত গোপনে পরিচালিত হয়েছিল।
সেন্টার ফর আর্মস কন্ট্রোল অ্যান্ড নন-প্রলিফারেশনের মতে, ওই সময় সংশ্লিষ্ট দলগুলো শুধু কারখানা থেকে স্থানীয় একটি বিমানবন্দরে গোপনে ইউরেনিয়াম সরানোর জন্য চার সপ্তাহ ধরে মোট ২৪ দিন ১২ ঘণ্টার শিফটে কাজ করেছিল।
মার্চের শেষদিকে গ্রোসি সিবিএস নিউজের কাছে স্বীকার করেন, আইএইএ ইরানের জন্যও একই ধরনের অভিযান বিবেচনা করছে।
কাজাখস্তানে শান্তিপূর্ণ সময়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সম্মতিতে ঘটনাটি শেষ হয়।
গ্রোসি স্পষ্ট করেন, এটা একটা কমন সেন্সের বিষয় যে, যেখানে বৃষ্টির মতো বোমা পড়ছে, সেখানে এই কাজ করা অসম্ভব।
আলজাজিরা থেকে অনূদিত

