পর্যাপ্ত সরবরাহের পরও বাড়ল জেট ফুয়েলের দাম
- আমদানি-রপ্তানিতে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা
- ‘অযৌক্তিক’ দাম পুনর্বিবেচনার আহ্বান

এক দিকে বলা হচ্ছে জ্বালানি সরবরাহ পর্যাপ্ত। অন্যদিকে বাড়ানো হয়েছে জেট ফুয়েলের দাম। আগের দামে কেনা থাকলে কেন জেট ফুয়েলের দাম বাড়ানো হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গত রাত থেকে জেট ফুয়েলের দাম ৮০ শতাংশ বেড়েছে। এতে প্রতি লিটার ঠেকেছে ২০২ টাকায়, যা ছিল ৯০ টাকা। হঠাৎ এই বৃদ্ধিতে শুধু বিমানের টিকিটে নয়, রপ্তানি ও আমদানিসহ বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলবে দেশের অর্থনীতিতে। বিশেষ করে রপ্তানিতে খরচ বাড়বে ও অসম প্রতিযোগিতা হবে, আমদানিতে ব্যয় বৃদ্ধি, শিল্প উৎপাদনে চাপ—সবমিলে বাজারে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিতে পড়বে দেশ। শুধু তাৎক্ষণিক নয়, প্রভাব পড়তে পারে দীর্ঘমেয়াদি। এমনটাই আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।
জেট ফুয়েলের দাম প্রায় ৮০ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে ‘অযৌক্তিক’ উল্লেখ করে তা দ্রুত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এওএবি)। মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়ার পর এওএবির সেক্রেটারি জেনারেল মফিজুর রহমান স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ আহ্বান জানানো হয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে বারবার জানানো হয়েছে দেশে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই। গত ২২ দিনে প্রায় ২৫টি তেলবাহী জাহাজ দেশে এসেছে। এসব তেল পূর্বনির্ধারিত মূল্যে কেনা হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও সাম্প্রতিক সময়ে তেলের মূল্য হ্রাস পেয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যৎ মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কাকে ভিত্তি করে এত বড় পরিসরে জেট ফুয়েলের মূল্য বৃদ্ধি করা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয় বলে এওএবি’র বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
সংগঠনের পক্ষ থেকে আগামীর সময়কে তাদের দেওয়া বক্তব্যের যথার্থতা নিশ্চিত করা হয়েছে।
এক মাসে দ্বিতীয়বার বাড়ল জেট ফুয়েলের দাম। মাসের শুরুতে লিটারে বেড়েছিল ১৭ টাকা, এবার বেড়েছে ৯০ টাকা। গতকাল মঙ্গলবার জেট ফুয়েলের নতুন দর ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। গত বছরের মে মাস থেকে প্রতি মাসে একবার দাম সমন্বয় করছে তারা। এই প্রথম এক মাসে দুই দফায় দাম সমন্বয় করা হলো। বিইআরসি’র মতে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক জ্বালানির দামে ব্যাপক ঊর্ধ্বগতি দ্বিতীয়বার দর সমন্বয়ের কারণ।
বিমান ভাড়ায় প্রভাব
জেট ফুয়েলের দাম বাড়ায় অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে বিমান ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাবে। যার ফলে চড়া দামে টিকিট কিনতে হবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে জনশক্তি রপ্তানির ওপর। নানা কারণে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম এ খাতটি ধুকছে। শ্রম বাজার সঙ্কুচিত হচ্ছে, পাসপোর্টের মান নেমে যাচ্ছে। এর সঙ্গে বিমান টিকিটের দাম যুক্ত হবে। মধ্যপ্রাচ্যগামী শ্রমিকদের খরচ অনেক বেড়ে যাবে। আগে থেকেই টিকিটের সঙ্কট ও বাড়তি ভাড়ার সমস্যা ছিল। এতে রেমিটেন্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সাধারণ ভ্রমণকারী এবং ওমরা-হজযাত্রীদের প্যাকেজ খরচও তরতরিয়ে বাড়বে।
‘বিমানের মোট ভাড়া নির্ধারণে জেট ফুয়েল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এয়ারক্রাফট কেনার বাইরে জ্বালানির পেছনে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পরিচালন ব্যয়ের ৪০ শতাংশই জ্বালানি খাতে। বেতন-অবকাঠামো, বিভিন্ন চার্জ বাবদ খরচ ৬০ শতাংশ। জেট ফুয়েলের দাম ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় তা যুক্ত হবে ৪০ শতাংশের খরচের সঙ্গে। এতে ব্যাপক হারে বিমানের ভাড়া বেড়ে যাবে বলে মনে করেন বিমান বাংলাদেশের সাবেক এক পরিচালক।’ এই কর্মকর্তা আরও জানালেন, ‘আকাশপথে কার্গো পরিবহনেরও খরচ একই হারে বাড়বে।’
যাত্রীবাহী বিমানের মতো ভাড়া বাড়বে কার্গো পরিবহনেও। এর ফলে সবজিসহ অন্যান্য কৃষিপণ্য, তৈরি পোশাকের পরিবহনের খরচ বাড়বে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে। রপ্তানি কমে গেলে গার্মেন্টস সেক্টর বড় ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। এরপরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় বড় ধাক্কা খাবে বাংলাদেশ। এদিকে সমুদ্রপথে নির্ভরতা থাকলেও জরুরি পরিস্থিতিতে আকাশপথে অনেক সময় পণ্য পরিবহন করতে হয়। ব্যবসায়িরা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য আকাশপথ ব্যবহার করেন।
তৈরি পোশাক, কাচাঁ সবজি ছাড়াও পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হিমায়িত খাদ্য (চিংড়ি ও অন্যান্য মাছ), তোয়ালে, বিছানার চাদরের মতো হোম টেক্সটাইল, প্রক্রিয়াজাত সবজি, চা, সুগন্ধি চাল, মশলা, তামাক, ইঞ্জিনিয়ারিং ও ইলেকট্রনিক্স পণ্য, প্লাস্টিক, ফার্মাসিউটিক্যালসের বিভিন্ন ধরনের ওষুধ রপ্তানি করে থাকে বাংলাদেশ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এয়ার কার্গোর ভাড়া বেড়ে গেলে বিদেশে পণ্য পাঠাতে বেশি খরচ হবে। পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে রপ্তানি পণ্যের দামও বৃদ্ধি পাবে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য তুলনামূলকভাবে বেশি দামী হয়ে যায় এবং ক্রেতারা অন্য দেশের সস্তা পণ্যের দিকে ঝুঁকতে পারে। বিশেষ করে যেসব দেশে জ্বালানির দাম তুলনামূলক কম, তারা বাজারে সুবিধা পায়। ফলে রপ্তানির অর্ডার কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
পরিবহন খরচের কারণে আমদানি পরিস্থিতিও বদলাবে। বিলাসি পণ্যসহ বাংলাদেশ শিল্পের কাঁচামাল আমদানী করে থাকে। এর মধ্যে তুলা অন্যতম, যা বস্ত্রশিল্পের কাঁচামাল। এদেশের বড় শিল্পগুলোর প্রায় সবগুলোর কাঁচামাল আমদানী নির্ভর হওয়ায় সামগ্রিক অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির প্রভাব পড়বে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেছেন, জেট ফুয়েলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব নানা খাতে পড়বে। রপ্তানীতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে জনশক্তি রপ্তানী ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অন্যান্য রপ্তানিও প্রভাবিত হবে।

