আগামীর সময়

চীনের হুমকি বাড়ছে

তাইওয়ান ছেড়ে পালানোর পরিকল্পনা আঁটছেন বাসিন্দারা

তাইওয়ান ছেড়ে পালানোর পরিকল্পনা আঁটছেন বাসিন্দারা

সংগৃহীত ছবি

দক্ষিণ চীন সাগরে অবস্থিত পূর্ব এশিয়ার স্বশাসিত দ্বীপ রাষ্ট্র তাইওয়ানের সঙ্গে বেইজিংয়ের বিরোধ কয়েক দশকের। মূলভূখণ্ডের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত দ্বীপটিকে বেইজিং নিজেদের বিচ্ছিন্ন প্রদেশ বলে দাবি করে।

অন্যদিকে, পশ্চিমা বলয়ে থাকা তাইওয়ানের আছে নিজস্ব সংবিধান, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার এবং আলাদা সামরিক বাহিনী।

সামরিক অভিযানের মাধ্যমে তাইওয়ানের ভূখণ্ড দখলের হুমকি থাকলেও সম্প্রতি শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বাধীন বেইজিং দ্বীপটির ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্বের দাবি আরও জোরালো করেছে।

এ ছাড়া গত বছর তাইওয়ানকে একত্রীকরণের জন্য সরাসরি যুদ্ধের মহড়া ও প্রতীকী অবরোধের আয়োজন করে চীনের নিরাপত্তা বাহিনী।

এমন বাস্তবতায় তাইওয়ান প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক দায়িত্ব পালনের মেয়াদ বাড়িয়েছে। এছাড়া সম্ভাব্য আক্রমণ ঠেকানোর প্রস্তুতি হিসেবে যুদ্ধের মহড়ার প্রক্রিয়া ঢেলে সাজিয়েছে।

সম্ভাব্য সামরিক প্রস্তুতি হিসেবে কিছু তাইওয়ানি প্রাথমিক চিকিৎসা ও অস্ত্র চালানো শিখতে শুরু করেছেন। বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলারও প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।

অন্যদিকে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে তাইওয়ানের বাসিন্দাদের মধ্যে দেশ ছেড়ে পালানোর চেষ্টা বেড়েছে।


তাইপের অর্থ বিভাগে কর্মরত ৫১ বছর বয়সী নেলসন ইয়ে এমন একজন। তিন বছর আগে ইয়ে সিঙ্গাপুরে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার এবং তার সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ বিদেশে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

এরপর তিনি তুরস্কে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেন এবং নয় মাস পরে নিজের ও তার স্ত্রীর জন্য দ্বিতীয় পাসপোর্ট পান।

২০১৯ সালে হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থি বিক্ষোভে ইয়ে প্রায়ই ‘আজ হংকং, কাল তাইওয়ান’ স্লোগানটি শুনতেন।

তিনি আশঙ্কা করছেন, তাইওয়ানও হয়তো একদিন একই পরিণতির শিকার হবে।

ইয়ে যুক্তি দেখালেন, তাইওয়ান আক্রান্ত হলে তিনি নগদ অর্থ সহজে পাবেন এবং তার তুর্কি নথি ব্যবহার করে অবাধে যাতায়াত করতে পারবেন।

ইয়ের ভাষ্য, সংঘাতের সম্ভাবনা কম। কিন্তু যদি এমনটা হয়, তাহলে ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হবে।

‘তাই আমার একটি বিকল্প পরিকল্পনা থাকা উচিত বলে মনে করি’, যোগ করেন তাইওয়ানের এ নাগরিক।

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন, চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকট ইয়ের মতো অনেকের মনে সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

৬৭ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কুও কম্বোডিয়ায় সম্পত্তি কেনা শুরু করেছেন। প্রথমে তিনি এটি বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করলেও এখন চীনের সঙ্গে সংঘাতের আশঙ্কায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে রাখছেন।

চীন যে তাইওয়ানের বিরুদ্ধে অবিলম্বে সামরিক পদক্ষেপ নিতে চায়, তার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না। যদিও শি প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে তাইওয়ান দখলের হুমকি দিয়েছেন।

এমন পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রকে উসকে দিতে পারে এবং ইউক্রেনের মতো একটি ব্যয়বহুল সংঘাতের জন্ম দিতে পারে।

তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিংতে ৪০ বিলিয়ন ডলারের একটি সামরিক বিল প্রস্তাব করেছেন, যার মধ্যে ওয়াশিংটন ও তাইপের মধ্যে এযাবৎকালের অন্যতম বৃহত্তম অস্ত্র চুক্তি অন্তর্ভুক্ত।

ব্যাংককে কর্মরত একজন তাইওয়ানি রিয়েল এস্টেট এজেন্ট এডওয়ার্ড লাই অনুমান করছেন, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে হতাশার কারণেই আরও বেশি তাইওয়ানি থাইল্যান্ডে সম্পত্তি কিনছেন। থাই এ কর্মকর্তা বলেছেন, আজকাল তাইওয়ানে থাকা আমার বন্ধুরা প্রায়ই তাদের মধ্যে দেশ হারানোর তীব্র অনুভূতি কাজ করছে বলে জানায়।

ইয়ে দাবি করেছেন, বিদেশে নগদ টাকা রাখার ধারণাটি তিনি হংকংয়ের বন্ধুদের কাছ থেকে পেয়েছেন।

চীন বিক্ষোভ দমনে অঞ্চলটিতে ব্যাপক অভিযান চালায়। এ সময় হাজার হাজার স্থানীয় বাসিন্দা এলাকাটি ছেড়ে চলে যান।

যদিও বর্তমানে তাইওয়ান থেকে বড় আকারের কোনো দেশত্যাগের লক্ষণ নেই বলে দাবি বিদেশে লোক পাঠানো কনসালটেন্টদের। তাদের ভাষ্য, সম্পদ ও জীবনের নিরাপত্তার জন্য দেশ ছাড়তে চাইছেন অনেকে।

মেট্রোপলিটন ইমিগ্রেশন কনসাল্টিং গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার কেনি চিয়াং বলেছেন, দুই দশক আগে যখন প্রতিষ্ঠানটি চালু হয়, তখন তাইওয়ানের নাগরিকরা পশ্চিমা উন্নত দেশগুলোতে অভিবাসন করতে চাইতেন। কিন্তু গত পাঁচ বছরে, সেন্ট লুসিয়া, ভানুয়াতু এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো জায়গায় বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব বেছে নিচ্ছেন।

চিয়াং মনে করেন, আগে অভিবাসন বলতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গ্রিন কার্ড বা কানাডা থেকে মেপল লিফ কার্ড পাওয়া বোঝাত। এখন অভিবাসনের ক্ষেত্রে প্রত্যেকের লক্ষ্য সম্পদের নিরাপত্তা এবং নাগরিকত্ত্বে বৈচিত্র্য আনা।

৩৩ বছর বয়সী একজন তাইওয়ানি ডেটা সায়েন্টিস্ট ক্যাথি চেন, যিনি পাঁচ বছর আগে সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং তখন থেকেই বিদেশে অভিবাসনের সুযোগ খুঁজছেন।

যদিও তিনি বিশ্বাস করেন না যে শিগগির যুদ্ধ হবে; তবে চীনের সাম্প্রতিক কার্যক্রম তার ভয়কে আরও বাড়িয়েছে।

গত বছর চেন তার তাইওয়ানিজ স্বামীর সঙ্গে সান ফ্রান্সিসকোতে চলে যান এবং তার কোম্পানিতে কাজ করছেন।

এ বছর গ্রিন কার্ডের আবেদন করা চেন জানান, আমি শুধু একজন চীনা নাগরিক হওয়ার ঝুঁকি এড়াতে চাই।

অন্য একটি অভিবাসন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান লুবির ম্যানেজার মার্ক লিন ধারণা করেন, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে গত দুই বছরে বিদেশে যাওয়ার সংখ্যা দ্বিগুণ হলেও সংঘাতের সময় দেশত্যাগ করা সহজ হবে না।


সিএনএন থেকে অনূদিত

    শেয়ার করুন: