বিআইবিএম ডিজি
শরিয়া ব্যাংকিং শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, আস্থাভিত্তিক টেকসই

ইসলামী ব্যাংকগুলোতে শরিয়া প্রতিপালন (গভর্ন্যান্স) শুধু আনুষ্ঠানিকতার বিষয় নয়। এটি এসব ব্যাংকের জন্য আস্থা, অন্তর্ভুক্তিমূলক, সততা, জবাবদিহি এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসইয়ের ভিত্তিতে প্রতিপালনের ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা ইসলামী ব্যাংকিং পরিচালনায় বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। ফলে শরিয়া গভর্ন্যান্সের গুণগত মান শুধু কোনো প্রতিষ্ঠানভিত্তিক নিয়মে সীমিত রাখলে চলবে না। যদিও শরিয়া গভর্ন্যান্স যেভাবে মেনে চলা দরকার ছিল, সেই অর্থে চলতে ব্যর্থতা লক্ষ করা গেছে।
আজ সোমবার (৩০ মার্চ) রাজধানীর মিরপুরে এক সেমিনারে এসব কথা বলেছেন বিআইবিএমের মহাপরিচালক (ডিজি) ড. মো. এজাজুল ইসলাম। সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) এবং মালয়েশিয়ার আইএনসিআইএফএয়ের যৌথ আয়োজনে।
ড. এজাজুল ইসলাম বলেছেন, ‘সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু আনুষ্ঠানিক কাঠামো বজায় রাখা নয়, বরং এই শরিয়া কাঠামো বাস্তবে কার্যকরভাবে কাজ করছে তা নিশ্চিত করা। এটি শুধু গবেষণা বা সমস্যার চিহ্নিতকরণ কিংবা বিশ্লেষণে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। বরং এর বাস্তবভিত্তিক সংস্কার দরকার। বিশেষ করে স্বাধীন ও দক্ষ পরিচালনা পর্ষদ গঠন, করপোরেট গভর্ন্যান্সের সঙ্গে শরিয়া গভর্ন্যান্সের সমন্বয়, থ্রি লাইনস অব ডিফেন্স মডেলের আওতায় কার্যকর শরিয়া কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, অভ্যন্তরীণ শরিয়া অডিটের স্বাধীনতা ও মানোন্নয়ন, বহিরাগত শরিয়া রিভিউ ও ফিডুসিয়ারি রেটিং চালুকরণ, শরিয়া সুপারভাইজারি কমিটির সদস্যদের যোগ্যতার মানদণ্ড উন্নত করা, অংশীজনদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ব্যাংকিংব্যবস্থার সব স্তরে কাঠামোগত দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রয়োগ জরুরি।
‘শরিয়া গভর্ন্যান্স ইন ইসলামিক ব্যাংকস অব বাংলাদেশ : এন ইভালুয়েশন’ শীর্ষক সেমিনারে বিআইবিএমের ডিজি বলেছেন, আইআরবিএম গবেষণা, সংলাপ, প্রশিক্ষণ এবং নীতিগত সম্পৃক্ততার মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শরিয়া গভর্ন্যান্স শক্তিশালী করতে হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ইসলামী ব্যাংকগুলো, শরিয়া বিশেষজ্ঞ, পরিচালনা পর্ষদ, শীর্ষ ব্যবস্থাপনা এবং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
‘দেশের শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোকে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করতে হলে ক্ষতি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা জরুরি। অনেক গ্রাহক এখনো ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রমের প্রকৃত ধারণা সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নন। তাই গ্রাহকদের মাঝে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের নীতিমালা, কার্যপ্রক্রিয়া ও সুবিধাগুলো আরও সহজ ও সুন্দরভাবে তুলে ধরতে হবে’ —মনে করেন শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ।
‘শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোতে বিনিয়োগ (ঋণ) করার ক্ষেত্রে অনেক সময় প্রয়োজনীয় তথ্য গোপন করার অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ঋণ গ্রহণ করে তাদের একটি বড় অংশ পরে খেলাপি ঋণগ্রহীতায় পরিণত হয়, যা ব্যাংকিং খাতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ’—মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক এবং জনতা ব্যাংকের পরিচালক আব্দুল আউয়াল সরকার।
জনতা ব্যাংকের পরিচালকের ভাষ্য, ‘ইসলামী ব্যাংকিংয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নৈতিকতা ও ব্যক্তিগত সততা। ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যদি সৎ ও নীতিবান না হন, তাহলে শরিয়াহ আইন অনুসরণের ক্ষেত্রে ব্যত্যয় ঘটবে।’
শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোতে রেসিডেন্ট শরিয়াহ স্কলার (স্থায়ী শরিয়াহ বিশেষজ্ঞ) থাকা প্রয়োজন। যাতে ব্যাংকের প্রতিটি কার্যক্রম শরিয়াহ নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত ইস্যুগুলো নিয়মিত তদারকি করা যায়। পাশাপাশি শরিয়াহ নীতিমালা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকেও আরও কঠোর তদারকি ও নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক এই কর্মকর্তা।
ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) স্ট্যান্ডার্ড সেটিং ডিভিশনের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর নাবিল আহমেদ বলেছেন, অনেক শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকে ইন্টারনাল অডিট রিপোর্ট যথাযথভাবে প্রস্তুত বা উপস্থাপন করা হচ্ছে না, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত ও মানসম্মত অডিট রিপোর্ট প্রয়োজন।
সেমিনারে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন— মালয়েশিয়ার আইএসআরএ ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. সাঈদ বুহেরাওয়া, বাংলাদেশ ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং রেগুলেশনস অ্যান্ড পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ আনিসুর রহমান ও প্রবন্ধ উপস্থাপক বিআইবিএমের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. মাহাব্বাত হোসইন প্রমুখ।

