আগামীর সময়

গ্যাসের তীব্র সংকট

বাসাবাড়িতে জ্বলছে না চুলা, প্রভাব পড়ছে রপ্তানি আয়ে

বাসাবাড়িতে জ্বলছে না চুলা, প্রভাব পড়ছে রপ্তানি আয়ে

ফাইল ছবি

দেশজুড়ে শিল্প খাতে গ্যাসসংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। এর প্রভাব পড়েছে শিল্প-কারখানা, আবাসিক ও পরিবহনসহ প্রায় সব খাতে। বিশেষ করে টেক্সটাইল, গার্মেন্টস, সিরামিক ও স্টিলসহ উৎপাদনমুখী শিল্পগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।


সংশ্লিষ্টরা জানান, দুটি এলএনজি টার্মিনালের একটি রক্ষণাবেক্ষণে থাকায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। এটিই চলমান সংকটের প্রধান কারণ বলে তারা মনে করছেন।


শিল্পোদ্যোক্তাদের অভিযোগ, গ্যাসের ঘাটতির কারণে কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। ফলে উৎপাদন কমছে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়ছে এবং রপ্তানি আয় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় অনেক প্রতিষ্ঠান চুক্তি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হচ্ছে।
চাহিদা থাকা সত্ত্বেও অনেক উদ্যোক্তা নতুন রপ্তানি কার্যাদেশ গ্রহণ কমিয়ে দিয়েছেন বা বন্ধ রেখেছেন। এতে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।


পেট্রোবাংলা ও তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারের মহেশখালীতে স্থাপিত ভাসমান দুটি এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে একটি মেরামতে থাকায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। দুটি টার্মিনালের মোট সরবরাহ সক্ষমতা এক হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। স্বাভাবিক অবস্থায় দৈনিক গড়ে সাড়ে ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি গ্রিডে যোগ হয়। বর্তমানে তা নেমে এসেছে সাড়ে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কিছু বেশি।


পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় চার হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে সরবরাহ থাকে দুই হাজার ৮০০ থেকে তিন হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ নেমে আসে দুই হাজার ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের ঘাটতি দাঁড়ায় এক হাজার ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে।


তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির অপারেশন ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান গণমাধ্যমকে বলেন, মেরামতে থাকা এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ ইতোমধ্যে চালু করা হয়েছে। তবে পূর্ণ প্রভাব পেতে প্রায় ২৪ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং ধাপে ধাপে গ্যাসের চাপ বাড়ানো হচ্ছে। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত পাইপলাইনে গ্যাস ভরতে সময় লাগে বলেও তিনি জানান।


তিনি বলেন, স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে প্রায় ২৪ ঘণ্টা লাগতে পারে। গ্যাস স্বল্পতার প্রভাব আবাসিক খাতে বেশি অনুভূত হলেও শিল্পসহ সব খাতেই এর প্রভাব স্পষ্ট।
এদিকে চট্টগ্রাম, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানা কখনো চলছে, কখনো বন্ধ থাকছে। উদ্যোক্তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরেই গ্যাসসংকট চলছে। গত এক বছরে কয়েক শ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। রপ্তানি আয় কমেছে, বিনিয়োগ স্থবির এবং কর্মসংস্থানও বাড়ছে না। তাদের মতে, শিল্প খাত বাঁচাতে গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।


সাভারের ডিইপিজেডে এফসিআই বিডি লিমিটেডের মেইনটেন্যান্স ম্যানেজার মোখলেছুর রহমান বলেন, সকাল থেকে গ্যাস না থাকায় বয়লার ও ওয়াশিং ড্রায়ারসহ অনেক যন্ত্রপাতি চালানো যাচ্ছে না। বিকল্প হিসেবে ডিজেল ব্যবহার করতে হচ্ছে, এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন ১১ হাজার ৩২৩ সিএফটি গ্যাসের চাহিদা থাকলেও এখন চাহিদার ২০ শতাংশও পাওয়া যাচ্ছে না।


অকোটেক্স গ্রুপের ডিজিএম হোসাইন খালেক বলেন, গ্যাসসংকট তাদের জন্য মহামারি আকার নিয়েছে। অনেক ইউনিট প্রায় বন্ধ অবস্থায় রয়েছে। কিছু ইউনিট ডিজেলে চালাতে হচ্ছে, এতে ব্যয় গ্যাসের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ বেশি। প্রতিদিন বয়লার ও জেনারেটর চালাতে ১৬ হাজার কিউবিক মিটার গ্যাসের প্রয়োজন হলেও সরবরাহ না থাকায় এক দিনের ক্ষতি কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।


শিল্প-কারখানার মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই গ্যাসের ঘাটতি ছিল। আগে যে চাপ পাওয়া যেত, তা দিয়ে কোনোভাবে উৎপাদন চালানো সম্ভব ছিল। কিন্তু গত এক মাসে পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। গ্যাসের চাপ তিন ভাগের এক ভাগে নেমে আসে। ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে তা প্রায় শূন্যের কোঠায় পৌঁছে যায়।

    শেয়ার করুন: