মুনাফা কম, তবু দামে আগুন, অনিশ্চিত গন্তব্যে ছুটছে মুন্নু সিরামিক

শেয়ারবাজারের টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে সিরামিক খাতের কোম্পানি মুন্নু সিরামিক। গত ৭ মে সমাপ্ত সপ্তাহে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) শীর্ষ দর বৃদ্ধির তালিকায় প্রথম অবস্থানে ছিল কোম্পানিটি। মাত্র এক সপ্তাহে শেয়ারটির দাম বেড়েছে ৩২ দশমিক ৩ শতাংশ। ফলে দীর্ঘদিন ধরে ঝিমিয়ে থাকা এই শেয়ার ঘিরে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে স্বল্প মূলধনী ও কম ফ্রি-ফ্লোটের কিছু শেয়ারে অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় মুন্নু সিরামিকও আলোচনায় এসেছে। সপ্তাহ শেষে কোম্পানিটির শেয়ারদর দাঁড়ায় ১০৭ টাকা ২০ পয়সায়। এর আগে কয়েক মাস ধরেই শেয়ারটি ধীরে ধীরে ঊর্ধ্বমুখী ছিল।
লেনদেনেও সক্রিয় ছিল কোম্পানিটি। গত সপ্তাহে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ কোটি ৬৭ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে, যা মোট বাজার লেনদেনের প্রায় ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ। বাজার বিশ্লেষকদের ভাষায়, সামগ্রিক সূচক যখন চাপে ছিল, তখন মুন্নু সিরামিক ডিএসইএক্স সূচকে প্রায় ২ দশমিক ৭ পয়েন্ট যোগ করে ‘ইনডেক্স পুলার’ হিসেবেও ভূমিকা রেখেছে।
শেয়ারটির সাম্প্রতিক সময়ে উত্থান বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ালেও কোম্পানির মৌলভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। গত কয়েক বছরের আর্থিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ওঠা-নামার মধ্য দিয়ে গেছে।
২০২৩ অর্থবছরে কোম্পানিটির ইপিএস ছিল ২ টাকা ৯১ পয়সা। তবে ২০২৪ সালে তা নেমে আসে ২২ পয়সায়। সর্বশেষ চলতি অর্থবছরে তৃতীয় প্রান্তিকের তথ্য মতে ইপিএস কিছুটা বেড়ে ২৪ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ব্যবসায়িক মুনাফা এখনো স্থিতিশীল নয়।
একইভাবে লভ্যাংশ ঘোষণার ইতিহাসও খুব শক্তিশালী নয়। গত কয়েক বছরের নগদ লভ্যাংশের চিত্র ছিল এমন—২০২০: ৫ শতাংশ, ২০২১-২২-২৩ সালে ১০ শতাংশ, ২০২৪ : ১ শতাংশ এবং ২০২৫ : ২ শতাংশ। অর্থাৎ একসময় ১০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ লভ্যাংশ দিলেও সাম্প্রতিক সময়ে দুই বছরে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সর্বশেষ বছরে মাত্র ২ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে কোম্পানিটি।
এদিকে, কোম্পানিটির বর্তমান শেয়ারদরের তুলনায় আয় এখনো অনেক কম। ফলে পিই রেশিও অত্যন্ত বেশি অবস্থানে পৌঁছেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মুন্নু সিরামিকের পিই অনুপাত ৩০০ গুণের বেশি। অর্থাৎ কোম্পানির প্রতি ১ টাকার আয়ের বিপরীতে বিনিয়োগকারীরা ৩০০ টাকারও বেশি মূল্য দিচ্ছেন। এ ধরনের উচ্চ পিই সাধারণত বাজারে অতিরিক্ত জল্পনা বা স্বল্পমেয়াদি ট্রেডিং প্রবণতার ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
বাজার তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে মুন্নু সিরামিকের শেয়ারদর ৬৭ টাকা থেকে ১০২ টাকার মধ্যে ওঠানামা করেছে। তবে চলতি বছরের শুরু থেকে শেয়ারটিতে নতুন গতি দেখা যায়। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়েও শেয়ারটির দাম ছিল ৮৩ থেকে ৮৫ টাকার মধ্যে। সেখান থেকে কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে তা ১০৭ টাকায় উঠে আসে।
ব্রোকারেজ হাউসগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে বাজারে মৌলভিত্তির চেয়ে স্বল্প ফ্রি-ফ্লোট ও কমসংখ্যক শেয়ারের কোম্পানিগুলোতে দ্রুত দরবৃদ্ধির প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। মুন্নু সিরামিকের ক্ষেত্রেও সেই প্রবণতা কাজ করছে। তাদের মতে, কোম্পানিটির আয় ও লভ্যাংশ এখনো শক্ত অবস্থানে না গেলেও স্বল্পমেয়াদি ট্রেডিং চাহিদার কারণে দর বেড়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা, নগদ প্রবাহ ও ধারাবাহিক মুনাফার দিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।



