আগামীর সময়

ক্ষমতায় ফিরেই রমজানের বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠিন পরীক্ষায় বিএনপি

ক্ষমতায় ফিরেই রমজানের বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠিন পরীক্ষায় বিএনপি

ফাইল ছবি

দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিন থেকেই নতুন সরকারকে নাগরিক জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল ইস্যু, নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হচ্ছে। বাজারে সক্রিয় সিন্ডিকেট ভাঙা এবং দামের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই এখন তাদের তাৎক্ষণিক বড় চ্যালেঞ্জ।

দীর্ঘ দুই দশক পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পাওয়ার পর গতকাল মঙ্গলবার সরকার গঠন করেছে দলটি। এমন সময় শুরু হচ্ছে পবিত্র রমজান মাস, যখন নিত্যপণ্যের চাহিদা বেড়ে যায় এবং বাজারে অস্থিরতা বাড়ার আশঙ্কা থাকে।

সরকারি সূত্র জানায়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। গত বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি ভোগ্যপণ্য আমদানি করা হয়েছে। চিনি, ভোজ্যতেল, ছোলা, ডাল ও খেজুরসহ রমজানকেন্দ্রিক পণ্যের মজুদ ও সরবরাহ নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

তবে অভিজ্ঞতা বলছে, ‘মজুদ পর্যাপ্ত’ ঘোষণার পরও বাজারে তার প্রতিফলন সব সময় দেখা যায় না। ফলে সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে আস্থার সংকট থেকেই যায়।

নিম্ন আয়ের মানুষের চাপ কমাতে সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ এর কার্যক্রম বাড়ানো হচ্ছে। খোলাবাজারে টিসিবির ট্রাক সেলের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ করার কথা জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এতে শহরাঞ্চলে স্বল্পমূল্যে পণ্য পাওয়ার সুযোগ বাড়বে। তবে যেসব এলাকায় টিসিবির কার্যক্রম পৌঁছাবে না, সেখানে বাজারদরের চাপ বহাল থাকতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে সরবরাহ পরিস্থিতিই বড় নিয়ামক। লেবু বা বেগুনের মতো পণ্যে দীর্ঘমেয়াদি মজুদের সুযোগ নেই। মৌসুমি উৎপাদন ও পরিবহনব্যবস্থার ওপরই দাম নির্ভর করে। কৃষক পর্যায়ে ৪০ টাকা কেজির বেগুন শহরের খুচরা বাজারে ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হওয়া বাজার কাঠামোর দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। মধ্যস্বত্বভোগী ও সরবরাহ চেইনের অস্বচ্ছতাকে এর জন্য দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, এবার কঠোর নজরদারি থাকবে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এবারের রমজানের পণ্য আমদানি ও মজুদের বড় অংশ সম্পন্ন হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে। ফলে রোজার শুরুতে দাম বাড়লে তার পুরো দায় নতুন সরকারের ওপর বর্তাবে না। তবে দামের স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে তারা কী কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই নজর থাকবে সবার।

কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, এটি চ্যালেঞ্জিং হলেও অসম্ভব নয়। শুরু থেকেই বাজার ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সমন্বিত কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। সরবরাহ নিশ্চিত করা, কৃত্রিম সংকট ঠেকানো, নিয়মিত তদারকি এবং তথ্যের স্বচ্ছতা একসঙ্গে কার্যকর হলে ইতিবাচক ফল মিলতে পারে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক দক্ষতার সমন্বয় ঘটাতে পারলে রমজানের মতো সংবেদনশীল সময়েও বাজারে স্বস্তি ফেরানো সম্ভব।

ক্যাবের সহসভাপতি এস এম নাজের হোসেন বলেন, রোজার ঠিক আগমুহূর্তে দায়িত্ব নেওয়ায় এটি নতুন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা। বাজারে অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া গেলে মানুষের আস্থা বাড়বে।

সরকারি হিসাবে, দেশে ভোজ্যতেলের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২৫ লাখ টন। এর মধ্যে রমজানে প্রয়োজন হয় প্রায় তিন লাখ টন। স্থানীয় উৎপাদন প্রায় পাঁচ লাখ টন এবং আমদানি ও পাইপলাইনে থাকা মজুদ মিলিয়ে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক বলে দাবি করা হয়েছে। মসুর ডাল, চিনি, পেঁয়াজ ও ছোলার ক্ষেত্রেও একই চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে পেঁয়াজে স্থানীয় উৎপাদন চাহিদার চেয়ে বেশি বলে জানানো হয়েছে।

তবে রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বেশির ভাগ নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। গত দুই দিনে বেগুনের দাম ৬০ টাকা থেকে বেড়ে ৯০ থেকে ১২০ টাকা কেজিতে উঠেছে। কাঁচা মরিচ ১৬০ টাকা থেকে বেড়ে ২০০ থেকে ২৪০ টাকা, শসা ৮০ টাকা থেকে বেড়ে ১০০ থেকে ১২০ টাকা হয়েছে। অন্যান্য সবজির দামও ঊর্ধ্বমুখী।

ছোলা কেজিপ্রতি ১০০ থেকে ১১০ টাকা, সয়াবিন তেল ১৯৫ টাকা, দেশি চিকন মসুর ডাল ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা এবং মোটা দানার মসুর ডাল ১২০ থেকে ১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশি পেঁয়াজ ৬০ থেকে ৭০ টাকা, ব্রয়লার মুরগি ১৯০ থেকে ২০০ টাকা, ডিম ডজনপ্রতি ১১০ থেকে ১২০ টাকা এবং চিনি ১০০ থেকে ১০৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লেবুর দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। ছোট লেবুর হালি ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং বড় লেবু ১২০ থেকে ১৬০ টাকা পর্যন্ত।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বাজারে সিন্ডিকেট ভেঙে ব্যবসায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা। শুধু ভ্রাম্যমাণ অভিযান নয়, সরবরাহ চেইনের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও তথ্য প্রকাশ নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত মনিটরিং, দৃশ্যমান শাস্তি এবং সমন্বিত নীতি বাস্তবায়ন ছাড়া বাজার স্থিতিশীল রাখা কঠিন হবে।

পর্যাপ্ত মজুদের দাবি থাকলেও প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হবে রমজানের প্রথম সপ্তাহেই। ভোগ্যপণ্যের নির্বিঘ্ন সরবরাহ, নিয়ন্ত্রিত দাম এবং কার্যকর জবাবদিহিই নির্ধারণ করবে নতুন সরকারের প্রথম রমজান কতটা স্বস্তির হয়।

    শেয়ার করুন: