আগামীর সময়

মাইকেল জ্যাকসনের সম্পদ নিয়ে নতুন লড়াই

মাইকেল জ্যাকসনের সম্পদ নিয়ে নতুন লড়াই

সংগৃহীত ছবি

পপসংগীতের কিংবদন্তি মাইকেল জ্যাকসনের মৃত্যুর ১৬ বছর পরও তার বিপুল সম্পদকে ঘিরে আইনি লড়াই শেষ হয়নি। নতুন করে আইনি লড়াই শুরু করেছেন জ্যাকসন কন্যা প্যারিস। প্রায় ২০০ কোটি ডলারের একটি এস্টেটকে কেন্দ্র করে চলা এই বিরোধ শুধুই আর্থিক দ্বন্দ্ব নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ দখলের লড়াইয়ে রূপ নিচ্ছে।

লস অ্যাঞ্জেলেসের প্রোবেট কোর্টে দাখিল করা নথিতে প্যারিস জ্যাকসনের আইনজীবী ক্রেগ পিটার্স দাবি করেছেন, মাইকেল জ্যাকসনের এস্টেটের সহ-নির্বাহী জন ব্রাঙ্কা এবং জন ম্যাকক্লেইন দীর্ঘদিন ধরে সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনা করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা শত শত মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ না করে ফেলে রেখেছেন। একই সঙ্গে নিজেদের জন্য অতিরিক্ত ফি ও বোনাস নিয়েছেন। প্যারিসের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ২০০৯ সালে মাইকেল জ্যাকসনের মৃত্যুর সময় প্রায় ৫০ কোটি ডলারের ঋণে ডুবে থাকা এস্টেটকে পুনরুদ্ধারের নামে নির্বাহীরা শুধুমাত্র নিজেদের আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করেছেন।

তবে এই অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন ব্রাঙ্কা ও ম্যাকক্লেইন। এস্টেটের আইনজীবী জনাথন স্টেইনসাপির দাবি করেছেন, প্যারিস এবং তার আইনজীবীরা আদালত ও আইনি ব্যবস্থার অপব্যবহার করছেন। তার ভাষ্য, তারা একের পর এক মিথ্যা অভিযোগ তুলে মিডিয়ায় প্রচারণা চালাচ্ছেন, যাতে তাদের আইনি দুর্বলতা আড়াল করা যায়।

‘সাম্প্রতিক এই পদক্ষেপগুলো এসেছে এমন এক সময়, যখন প্যারিসের পক্ষের একটি আপিল ইতিমধ্যেই খারিজ হয়ে গেছে’, যোগ করেন জনাথন।

এস্টেটের সর্বশেষ দাখিল করা নথিতে আরও বলা হয়েছে, প্যারিসের পক্ষ থেকে তোলা অভিযোগগুলো মূলত সংবাদের ‘শিরোনাম পাওয়ার জন্য তৈরি’ এবং ‘ভিত্তিহীন উদ্বেগ’। তারা দাবি করেছে, গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নেওয়া প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আদালতের তত্ত্বাবধানে অনুমোদিত হয়েছে। সব চুক্তি ও আর্থিক লেনদেন যথাযথভাবে নথিভুক্ত রয়েছে।

এই বিরোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এত বড় অঙ্কের সম্পদ থাকা সত্ত্বেও মূল বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মাত্র ৬ লাখ ২৫ হাজার ডলার ফি ও বোনাসের হিসাব।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, ‘এটা পুরো এস্টেটের তুলনায় একেবারেই নগণ্য। যা একটি বড় চুক্তির এক শতাংশেরও কম। বিষয়টি টাকার নয়, বরং নিয়ন্ত্রণের।’ ওই সূত্র আরও দাবি করেছে, প্যারিসের আইনজীবী ক্রেগ পিটার্স এই সুযোগে এস্টেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

অন্যদিকে, প্যারিস জ্যাকসন সম্প্রতি তার বাবাকে নিয়ে নির্মিত নতুন বায়োপিক মাইকেল নিয়েও প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছেন। আগামী মাসে মুক্তির অপেক্ষায় থাকা এই ছবিতে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে তিনি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেছেন, ছবিটি নির্মাণে এস্টেট প্রায় ১৫‌ কোটি ডলার ব্যয় করেছে, যা ছবিটি সফল হলেই পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে। এই বিষয়ে প্যারিসের পাশে দাঁড়িয়েছেন তার ফুফু জ্যানেট জ্যাকসন, যিনি পারিবারিক প্রদর্শনের পর ছবিটি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

এস্টেটের পক্ষ থেকে পাল্টা যুক্তিতে বলা হয়েছে, ব্রাঙ্কা ও ম্যাকক্লেইন দীর্ঘদিন ধরে মাইকেল জ্যাকসনের উত্তরাধিকারকে বিশ্বব্যাপী একটি সফল ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন।

তাদের দাবি, তারা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এস্টেট প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার আয় করেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালে সনি মিউজিক গ্রুপের সঙ্গে করা চুক্তির মাধ্যমে মাইকেল জ্যাকসনের সংগীত ক্যাটালগের ৫০ শতাংশ বিক্রি করে অন্তত ৬০ কোটি ডলার আয় করা হয়েছে।

প্যারিসের পক্ষ থেকে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, ‘বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ না করে ফেলে রাখা হয়েছে।’ এ বিষয়েও নির্বাহীরা ব্যাখ্যা দিয়েছেন, ‘এস্টেটের উল্লেখযোগ্য অংশের অর্থ একটি কর সংক্রান্ত বিরোধের কারণে আইআরএসের নিয়ন্ত্রণে থাকা এসক্রো অ্যাকাউন্টে আটকে ছিল। প্রায় ৭০ কোটি ডলারের এই বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সেই অর্থ বিনিয়োগ করার সুযোগই ছিল না।’

এছাড়া, প্যারিসের পক্ষ থেকে প্রয়াত সংগীত প্রযোজক কুইন্সি জোন্সের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থপ্রদানের বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। জবাবে নির্বাহীরা জানিয়েছেন, এসব অর্থপ্রদান ছিল একটি বৈশ্বিক সমঝোতা চুক্তির অংশ, যা একাধিক আইনি দাবি নিষ্পত্তির জন্য করা হয়েছিল।

এসব তথ্য ২০২২ সাল থেকে নিয়মিতভাবে বৈঠক ও আদালতে দাখিল করা নথিতে প্রকাশ করা হয়েছে।

এস্টেট আরও বলেছে, বিমান ভ্রমণ সংক্রান্ত ব্যয় নিয়েও যে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, তার সব চুক্তি ও রিইমবার্সমেন্টের তথ্য ২০২৩ সালেই প্যারিসের আইনজীবীদের কাছে সরবরাহ করা হয়েছিল। তাদের দাবি, এসব নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়া মানে হলো আগেই দেওয়া নথিগুলো যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা হয়নি।

ব্রাঙ্কা ও ম্যাকক্লেইনের যোগ্যতা নিয়েও যে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, তা ‘গুরুত্ব দেওয়ার মতো নয়’ বলে দাবি করেছে এস্টেট।

তারা উল্লেখ করেছে, এই দুই নির্বাহীর প্রযোজনায় তৈরি হয়েছে ‘দিস ইজ ইট’—যা সর্বকালের সর্বোচ্চ আয় করা কনসার্ট ডকুমেন্টারি, লাস ভেগাসের ‘মাইকেল জ্যাকসন ওয়ান’ শো, এবং টনি অ্যাওয়ার্ডজয়ী ‘এমজে: দ্য মিউজিক্যাল’। এছাড়া তারা স্পাইক লি পরিচালিত ‘ব্যাড ২৫’, ‘জার্নি ফ্রম মোটাউন টু অফ দ্য ওয়াল’ এবং ‘থ্রিলার ৪০’-এর মতো সিনেমাতেও কাজ করেছেন।

নির্বাহীরা দাবি করেছেন, এসব কাজের জন্য তারা আলাদা কোনো প্রযোজক ফি নেন না; বরং এগুলো তাদের আদালত-অনুমোদিত দায়িত্বের অংশ।

নথি অনুযায়ী, প্যারিস জ্যাকসন ইতিমধ্যেই এই এস্টেট থেকে ৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বেশি অর্থ পেয়েছেন এবং ভবিষ্যতে তার দুই ভাইয়ের সঙ্গে পুরো সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হওয়ার কথা রয়েছে। তার ভাইদের মধ্যে প্রিন্স জ্যাকসন নাকি তাকে এই বিরোধ থেকে সরে এসে পরিবারের সঙ্গে একত্রিত হওয়ার জন্য বোঝাতে চেষ্টা করছেন, বিশেষ করে নতুন বায়োপিকের প্রিমিয়ারকে সামনে রেখে।

এস্টেটের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, গত ১৬ বছরে এস্টেট থেকে করা কোনো অর্থপ্রদান কখনো আদালত দ্বারা বাতিল করা হয়নি। জনাথন স্টেইনসাপিরের ভাষায়, ‘এটা বিস্ময়কর যে প্যারিস জ্যাকসন তার আইনজীবীদের মাধ্যমে এমন অভিযোগ তুলছেন, যখন তিনি নিজেই এই এস্টেটের সফল ব্যবস্থাপনার বড় সুবিধাভোগী এবং ভবিষ্যতে আরও লাভবান হবেন।’

সূত্র: পেজ সিক্স

    শেয়ার করুন: