মমতার সঙ্গ ছাড়ছেন দুধের মাছিরা

কবীর সুমন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও রাজ চক্রবর্তী
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে আবারও হাওয়া বদলের ইঙ্গিত। সুসময়ে যারা ঘাসফুল শিবিরের ছত্রছায়ায় থেকে ক্ষমতার মধু খেয়েছেন, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সেই দুধের মাছিরা এবার মমতার সঙ্গ ছাড়তে শুরু করেছেন। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাপ্রবাহ এবং নেতাদের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র গুঞ্জন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শাসকদলের দাপটের সময় একদল নেতা ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে ভিড়েছিলেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে যখন দল বিধানসভার ভোটে হারল, তখন সেই সুযোগসন্ধানীর অনেকে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পা বাড়াচ্ছেন। এদেরই গ্রামবাংলার রাজনীতিতে প্রচলিত অর্থে ‘দুধের মাছি’ বলে কটাক্ষ করা হচ্ছে।
ভারতের বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর সংগীতশিল্পী কবীর সুমন এক বিতর্কিত মন্তব্য করেন। তৃণমূলের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজেকে দলটির সমর্থক নন বলে জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেছেন, সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলকে ভোট দিলেও সন্তুষ্ট ছিলেন না দলের নানা কর্মকাণ্ডে।
এক সাক্ষাৎকারে এই সংগীতশিল্পী বলেছেন, ‘আমি তো তৃণমূলের সদস্য নই, আমি তৃণমূলপন্থিও নই। আগে আমি কোনো পার্টির সদস্যও ছিলাম না। মমতা আমার প্রায় হাতে-পায়ে ধরে দাঁড় করিয়েছিলেন। পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়া মাত্রই আমি পদত্যাগ করি।’
তবে একই সঙ্গে তিনি জানান, ভবিষ্যতে ভোট হলে তৃণমূলকেই ভোট দেবেন। তবে কোনো শক্তিশালী কমিউনিস্ট দল সামনে এলে এই বয়সেও তাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ রয়েছে এবং তাদের জন্য কাজ করার ইচ্ছাও প্রকাশ করেন।
সম্প্রতি চলচ্চিত্র নির্মাতা রাজ চক্রবর্তীও রাজনীতি থেকে পুরোপুরি বিদায় নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ব্যারাকপুর আসনে তৃণমূলের টিকিটে লড়লেও তিনি বিজেপির কৌস্তভ বাগচীর কাছে ১৫ হাজার ৮২২ ভোটের ব্যবধানে হেরে গেছেন। নির্বাচনে হারার পরেই তার এমন সিদ্ধান্ত ভালো করেই বুঝিয়ে দেয়, মমতার ওপর আস্থা হারিয়েই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন তিনি।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দুধের মাছিদের এই চঞ্চলতা নতুন কোনো ঘটনা নয়। ক্ষমতার পালাবদল বা প্রতিকূল পরিস্থিতি এলে একদল সুবিধাবাদী যে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, কবীর সুমন বা রাজ চক্রবর্তীর মতো ব্যক্তিত্বদের সাম্প্রতিক অবস্থান তারই প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কেউ অভিমানে রাজনীতি ছাড়ছেন, আবার কেউ দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিন্ন করে নতুন আদর্শের খোঁজে নামছেন। তবে তৃণমূলের মতো একটি বিশাল সংগঠনে এই ধরনের ভাঙন বা বিচ্ছেদ দলের জন্য বড় কোনো অশনিসংকেত, নাকি এটা স্বচ্ছ হওয়ার সুযোগ— তা সময়ই নির্ধারণ করবে।
আপাতত পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ময়দানে এখন একটাই প্রশ্ন— মমতার পাশে শেষ পর্যন্ত থেকে যাবেন কারা, আর বসন্তের কোকিলের মতো উড়াল দেবেন কে কে?



