ইউরোপ মাতালেও নিজ মহাদেশে কেন ব্রাত্য আফ্রিকান গায়করা

বার্না বয়, টায়লা, উইজকিড ও টেমস। ছবি: সংগৃহীত
আফ্রিকান পপ গানের জোয়ার এখন কাঁপিয়ে দিচ্ছে পুরো দুনিয়া। বার্না বয় থেকে শুরু করে টায়লা সবাই এখন মাতাচ্ছেন প্যারিস, নিউ ইয়র্ক আর লন্ডনের বিশাল সব স্টেজ। ঝকঝকে এলইডি স্ক্রিন আর কোটি টাকার সব আয়োজন থাকে তাদের প্রতিটি কনসার্টে।
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, তারা নিজেদের আক্রা বা জোহানেসবার্গের মতো চেনা শহরগুলোতে একদমই দেখা দেন না। নিজের দেশের গান নিয়ে তারা বিশ্ব জয় করছেন ঠিকই, কিন্তু নিজের মাটির মানুষরাই বঞ্চিত হচ্ছেন তাদের সরাসরি গান শোনা থেকে। এর ফলে এক অদ্ভুত দূরত্ব তৈরি হচ্ছে শিল্পী আর তাদের শেকড়ের দর্শকদের মাঝে।
গত কয়েক বছরে পশ্চিম আর দক্ষিণ আফ্রিকার গানগুলো বদলে দিয়েছে বিশ্ব সংগীতের মানচিত্র। আফ্রোবিটস আর আমাপিয়ানো গানগুলো এখন কোটি কোটি মানুষ শুনছেন ইন্টারনেটে। কিন্তু নিজের মহাদেশে একটি লাভজনক কনসার্ট ট্যুর করা এখনও যেন এক পাহাড় সমান চ্যালেঞ্জ।
রেমা যখন তার বিশ্ব ভ্রমণের ঘোষণা দিলেন, তখন তার তালিকায় ছিল আমেরিকা আর ইউরোপের লম্বা লাইন। অথচ বিশাল এই আফ্রিকা মহাদেশে তিনি শো করেছেন মাত্র তিনটি দেশে। আসলে শিল্পীরা যে ঘরে গান গাইতে চান না তা নয়, বরং আয়োজনের ঝক্কি সামলানোই এখানে মুশকিল।
ইউরোপের দেশগুলোতে শিল্পীরা বাসে চড়েই অনায়াসে এক শহর থেকে অন্য শহরে চলে যান। কিন্তু আফ্রিকার চিত্রটি একদমই ভিন্ন, কারণ এখানে এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশের সড়ক পথ নেই বললেই চলে। আবার দস্যু আর চাঁদাবাজদের ভয়ে দামি সব যন্ত্রপাতি নিয়ে রাস্তায় বের হওয়া মানেই যেন জান হাতে নিয়ে বের হওয়া।
বিমানে যাতায়াত করা ছাড়া এখানে কোনো গতি নেই, আর আফ্রিকার ভেতর বিমান ভাড়া ইউরোপের চেয়ে অনেক বেশি। ঔপনিবেশিক আমলের সেই পুরনো নিয়মগুলো আজও আটকে রেখেছে আফ্রিকার আকাশপথকে, যার ফলে যাতায়াত খরচ হয়ে দাঁড়ায় আকাশচুম্বী।
বিশাল সব ফুটবল স্টেডিয়াম আফ্রিকায় থাকলেও সেখানে গান গাওয়ার মতো মাঝারি মানের হলের বড় অভাব। ফুটবল মাঠের গ্যালারি ভরানোর মতো টাকা অনেক সাধারণ মানুষের পকেটে নেই, আবার লোক কম হলে কনসার্টের আমেজই থাকে না। তাই আয়োজকরা তখন বাধ্য হয়ে হোটেলের গাড়ি রাখার জায়গা বা খোলা মাঠে অস্থায়ী স্টেজ বানান।
গান শোনার জন্য ভালো সাউন্ড সিস্টেম বা আলোর সরঞ্জাম ভাড়ায় পাওয়াও এখানে এক মহা দুশ্চিন্তার বিষয়। এর ওপর আছে শিল্পীদের আকাশছোঁয়া পারিশ্রমিক, যা জোগাড় করা স্থানীয় আয়োজকদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
অনলাইনে গান শুনে যে টাকা আয় হয়, সেটিও আফ্রিকার ক্ষেত্রে অনেক কম। স্পটিফাই বা অ্যাপল মিউজিক বিদেশের তুলনায় আফ্রিকায় তাদের সাবস্ক্রিপশন ফি অনেক কম রাখে। এর ফলে ইউরোপ-আমেরিকা থেকে শিল্পী যে পরিমাণ টাকা কামাতে পারেন, নিজের দেশ থেকে তার দশ ভাগের এক ভাগও জোটে না।
তবে এই খাতের উন্নতি দেখে এখন বিদেশি কিছু বড় কোম্পানি আফ্রিকায় বড় মাঠ বানানোর দিকে নজর দিচ্ছে। যদিও স্থানীয় মানুষের ভয় যে, বিদেশিরা এই বাজার দখল করলে পরে হয়তো তারা হাত গুটিয়ে নেবে।
আসলে সবকিছুর শেষে মার খাচ্ছেন সেই সাধারণ সংগীতপ্রেমীরাই। বড় বড় কনসার্টের টিকিটের দাম এখন সাধারণ মানুষের এক মাসের বেতনের চেয়েও বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের দেশের প্রিয় শিল্পীর গান শুনতে গিয়ে পকেটে টান পড়ছে দেখে মানুষ এখন মোবাইল স্ক্রিনেই ভরসা রাখছেন।
লন্ডনের মানুষ যখন আফ্রিকান গানের তালে তাল মিলিয়ে গান গায়, তখন আফ্রিকার ভক্তরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কেবল তাকিয়ে থাকেন। নিজের দেশের গান হয়েও যেন তা আজ নিজের দেশের মানুষের কাছেই এক দূর আকাশের তারা।
সূত্র: গার্ডিয়ান





