আগামীর সময়

চলচ্চিত্র রিভিউ

একমুঠো নস্টালজিয়া-ইমোশনের গল্প ‘বনলতা এক্সপ্রেস’

একমুঠো নস্টালজিয়া-ইমোশনের গল্প ‘বনলতা এক্সপ্রেস’

সংগৃহীত ছবি

বনলতা এক্সপ্রেস সিনেমাটি দেখতে বসে মনে হয়েছে অনেক দিন পর আবার চেনা সেই হুমায়ূন আহমেদের জগতে ফিরে গেলাম। তানিম নূর মূল উপন্যাসের সুরটা ঠিক রেখে চিত্রনাট্যে আধুনিক গতি আনার চেষ্টা করেছেন। গল্পের শুরুটা কিছুটা ধীরস্থির, চরিত্রগুলোর সাথে পরিচিত হতে সময় নেয়। কিছু সংলাপ একটু দীর্ঘ মনে হতে পারে, তবে ইন্টারভালের পর গল্প যখন ডালপালা মেলতে শুরু করে, তখন দর্শক পুরোপুরি মিশে যায়। শেষটা দেখে মনে হয়েছে-ইস, যদি যাত্রাটা আরও কিছুক্ষণ চলত!


এই সিনেমার মেরুদণ্ড যদি কাউকে বলতে হয়, তবে তিনি মোশাররফ করিম। অধ্যাপক আবদুর রশিদের চরিত্রে তিনি এক কথায় অনবদ্য! হাসি, রাগ, গভীর আবেগ কিংবা সূক্ষ্ম হিউমার-সবকিছুতে তিনি এতই সাবলীল ছিলেন। বিশেষ করে ডায়লগ ডেলিভারিতে তাঁর সেই সিগনেচার স্টাইল সিনেমাটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। শুধু নিজের চরিত্রটাকে জীবন্ত করাই না, অনেক জায়গায় অন্য অভিনেতাদেরও টেনে নিয়ে গেছেন। পুরো সিনেমা জুড়ে তাঁর উপস্থিতি একটা শক্ত ভিত তৈরি করে।

অভিনয়ের কথা বলতে গেলে শরিফুল রাজকে নিয়ে একটা আফসোস থেকেই যায়। তিনি ভালো করেন, কিন্তু বারবারই দেখা যায় তাঁর পাশেই কেউ না কেউ আরও বেশি উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন। আলোটা পুরোপুরি নিজের দিকে টানতে পারেননি। মোশাররফ করিমের মতো মহীরুহের পাশে তাঁর আলোটা কিছুটা ম্লান লেগেছে।


চঞ্চল চৌধুরী শিক্ষামন্ত্রী আবুল খায়ের চরিত্রে বরাবরের মতোই স্বাভাবিক। চঞ্চল চৌধুরী যতটুকু সময় পেয়েছেন, নিজের মতোই ছিলেন। তবে তাঁর চরিত্রের মাধ্যমে নৈতিকতার বার্তা দেওয়ার বিষয়টি মাঝে মাঝে কিছুটা `ফোর্সড' মনে হয়েছে। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসে আবুল খায়ের ছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তবে তানিম নূর তার সিনেমায় শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দেখিয়েছেন। যদিও শিক্ষামন্ত্রীর মন্ত্রিত্ব নিয়ে টানাপোড়েনের গল্পটিও আরেকটু সবল হতে পারত। মন্ত্রীর স্ত্রী সুরমা চরিত্রে আজমেরী হক বাঁধন অভিনয় করলেও তার অভিনয় কোথাও কোথাও একটু অতিনাটকীয় বা ‘ওভার’ মনে হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রীর স্ত্রীর চরিত্রটি গল্পের মধ্যে কিছুটা আলগাভাবে থেকে গিয়েছে, আরও বজ্র আঁটুনি দরকার ছিল। চিত্রার বড় চাচার চরিত্রে ইন্তেখাব দিনার খাপেখাপে মিলে গিয়েছেন।

জাকিয়া বারী মম আবেগের জায়গাগুলো সুন্দরভাবে ধরে রেখেছেন। আফিয়া চরিত্রে আবেগের পরিমিত প্রকাশ ঘটিয়েছেন। শ্যামল মাওলা, মমর সন্দেহপ্রবণ স্বামী আজিজ চরিত্রে দারুণ ছিলেন। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসে আজিজ ছিলেন মাওলানা। তানিম নূরের সিনেমায় আজিজ মাওলানা নয়, নিরাপত্তাহীনতা ও সন্দেহবাতিকে ভোগা এক সাধারণ মানুষ, যে আসন্নপ্রসবা স্ত্রীকেও একজন পুরুষ ডাক্তারের চিকিৎসা নিতে দিতে নারাজ। এই পরিবর্তনটি খুব গুরুত্ববহ।
শ্যামল মাওলার কন্যা নিতুর চরিত্রে তৃধা পাল মান নামের ছোট্ট মেয়েটি পুরো সিনেমায় আলাদা নজর কেড়েছে। সাবিলা নূরকে চিত্রা চরিত্রে মানিয়েছে, তবে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণীর চপলতা ফুটিয়ে তুলতে তাঁর কিছুটা বেগ পেতে হয়েছে। সুধীর চন্দ্র দাসের চরিত্রে এ কে আজাদ সেতু বরাবরই অসাধারণ ছিলেন।

আসহাবের মায়ের চরিত্রে শামীমা নাজনীন যেন হুমায়ূন আহমেদের সেই চিরচেনা পাগলাটে চরিত্রগুলোর সার্থক রূপদান করেছেন। এটি ছিল মেকারের এক মাস্টারস্ট্রোক। রুবি চরিত্রে লাবণ্য চৌধুরী দারুন অভিনয় করেছেন। আর তামিম করীমের চেহারা দ্বিধান্বিত প্রেমিক জাফরের সঙ্গে মানিয়েছিল, তবে মুড-বদলের জায়গাগুলোতে তাঁকে একটু আড়ষ্ট লেগেছে। জাফরের বন্ধু শাকিলের চরিত্রে সিফাত রহমান তুলনামূলকভাবে বেশি সাবলীল অভিনয় করেছেন। যমুনা চরিত্রে সাবরিন আজাদ আর যমুনার বরের চরিত্রে আরেফিন জিলানীও ভালো অভিনয় করেছেন। এঁরা ভবিষ্যতে আরও উল্লেখযোগ্য চরিত্রে অভিনয় করবেন, এই প্রত্যাশা রইল।

স্ক্রীনে চিত্রার বান্ধবী চরিত্রে গায়িকা মাশা ইসলাম তেমন খারাপ অভিনয় করেননি। অন্যদিকে ট্রেনের চাপরাশি, মন্ত্রীর পিএস, গায়ক আহমেদ হাসান সানির অভিনয় ও গায়কী, ডাক্তার এজাজ ও ফারুক আহমেদও তাদের মতো করে অভিনয় করেছেন। তবে স্ক্রিনে মুখ না দেখিয়েও বাচিক অভিনয়ের ঝলক দেখিয়ে নুহাশ হুমায়ূন (মোশাররফ করিমের ২৪ বছরের ছেলে) এক মৃত তরুণের আত্মার ভূমিকায় দর্শককে দারুণ আনন্দ দিয়েছেন। এই অদৃশ্য চরিত্রটি সিনেমায় আরও জায়গা পেতে পারত, সমাপ্তি বক্তব্যটুকু আরও জমাটি হতে পারত।

পুরো সিনেমার লোকেশন মূলত ট্রেনের দুই-তিনটি বগির ভেতর। কিন্তু তানিম নূরের মুন্সিয়ানা এখানেই যে, এক মুহূর্তের জন্যও একঘেয়েমি আসেনি। ট্রেনের ভেতর, স্টেশনে-সবকিছুই স্বাভাবিক মনে হয়েছে। সেলুন কোচের দৃশ্যগুলো বহুদিন মনে থাকবে। জাহিদ নীরবের সংগীত সিনেমাটির অন্যতম শক্তিশালী দিক। অর্থহীন, আইয়ুব বাচ্চু আর অর্ণবের গানগুলো যারা নব্বইয়ের দশকের ব্যান্ড মিউজিক শুনে বড় হয়েছেন, তাদের ভেতরে এক ধরনের সুখকর নস্টালজিয়া জাগিয়ে দেবে।

এই সিনেমায় বহু রাজনৈতিক সংলাপ আছে-কখনো হাস্যরস, কখনো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা অনুভূতির ছদ্মবেশে। সচেতন দর্শকমাত্রেই সেগুলো চিহ্নিত করতে পারবেন এবং এই ভেবেও আনন্দ পাবেন যে এসব সংলাপের সরল অর্থ সবাই বুঝলেও গভীর অর্থগুলো শুধু তাঁরই জন্য পরিচালক ও সংলাপ লেখকেরা রেখে দিয়েছেন।

সবকিছু ছাপিয়েও কিছু খামতি চোখে পড়ে। চিত্রনাট্যের শুরুতে যে ধীরগতি-আরও একটু কাজ করার সুযোগ ছিল। সিনেমার শেষটা সেই পুরোনো অতিনাটকীয়তা থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেনি, যদিও সাধারণ দর্শকদের জন্য এটি বেশ ‘ফিলগুড’ একটি অভিজ্ঞতা।

রেটিং: ৮/১০

সব মিলিয়ে বনলতা এক্সপ্রেস কেবল একটি যাত্রার গল্প নয়, এটি জীবনের টুকরো টুকরো আবেগের কোলাজ। যারা গত বছরের উৎসব পছন্দ করেছিলেন, তাদের জন্য এটি মাস্ট ওয়াচ।

    শেয়ার করুন: