গণভোট নিয়ে ভয়াবহ অপপ্রচার: এআই ভিডিওতে দেশপ্রেম বনাম দেশদ্রোহের ফাঁদ

ছবিঃ আগামীর সময়
আসন্ন গণভোটকে সামনে রেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে নজিরবিহীন ও উদ্বেগজনক মাত্রার অপপ্রচার। এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা ভুয়া ভিডিও ও ফটোকার্ডে রাজনৈতিক নেতা, তাদের পরিবার এবং জনপ্রিয় তারকাদের নাম ও মুখ ব্যবহার করে ছড়ানো হচ্ছে বিভ্রান্তিকর, উসকানিমূলক বার্তা। অভিযোগ উঠেছে, এই অপপ্রচারের লক্ষ্য একটাই, সাধারণ মানুষকে যুক্তি নয়, আবেগ ও ভয় দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করা।
‘আগামীর সময়’-এর অনুসন্ধানে অন্তত ৫০টি ফেইক ফেসবুক পেইজ ও আইডি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পরিকল্পিতভাবে পাঁচটি সংবেদনশীল বিষয়কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে- মুক্তিযুদ্ধ, ধর্মীয় অনুভূতি, জাতীয় পরিচয়, দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার চেতনা, ভয় ও হুমকি। অপপ্রচারের কৌশলও প্রায় একই রকম। পরিচিত মুখ ব্যবহার করে বিশ্বাস তৈরি, আবেগী ও উসকানিমূলক ভাষায় মানুষকে নাড়িয়ে দেওয়া, আর “হ্যাঁ” ও “না” ভোটকে যুক্তির জায়গা থেকে সরিয়ে এনে দেশপ্রেম বনাম দেশদ্রোহের দ্বন্দ্বে পরিণত করা।
‘শুয়েব বল্গ’ নামের একটি পেজে এআই প্রযুক্তিতে তৈরি ভিডিওতে তারেক রহমান, তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান ও কন্যা জাইমা রহমানকে জড়িয়ে বলা হচ্ছে- “গণভোটে হ্যাঁ মানে পাকিস্তান, না মানে বাংলাদেশ।” একই কৌশলে আরেকটি ভিডিওতে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে জড়িয়ে ছড়ানো হয় একই ধরনের বক্তব্য।
‘মো. জামিল হোসেন’ নামের একটি আইডি থেকে ছড়ানো ভিডিওতে হুমকির সুরে বলা হয়, “না ভোট না দিলে এই দেশে জায়গা হবে না।” এছাড়াও ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে ‘জান্নাতুল আসমা’ নামের আরও একটি ফেক আইডি থেকে লেখা হয়- “১২ তারিখ মোনাফেকদের না বলুন, ৭১ বিরোধীদের না বলুন।”
অন্যদিকে ‘বিদ্রোহ সালাহ উদ্দিন’ নামের একটি পেজে চিত্রনায়িকা মৌসুমিকে জড়িয়ে দাবি করা হয়- “না ভোট দিলেই মুক্তিযুদ্ধের সম্মান রক্ষা হবে।”
এমনকি ক্রিকেটার তামিম ইকবালকেও ছাড় দেওয়া হয়নি। ‘এএনএম আরিফুল ইসলাম’ নামের একটি পেজ থেকে ছড়ানো ভুয়া ফটোকার্ডে লেখা-
“হ্যাঁ মানেই পাকিস্তানি।”
এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রিয়াজ বলেন, গণভোটকে ঘিরে ছড়ানো এসব তথ্যের কোনোটিই সঠিক নয়। জুলাই সনদে বিসমিল্লাহ বাদ দেওয়া বা ’৭১ মুছে ফেলার কোনো উল্লেখ নেই। তিনি বলেন, পরিকল্পিতভাবে মানুষের আবেগ উসকে দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চলছে, যা রাষ্ট্র ও সমাজ- উভয়ের জন্যই অত্যন্ত বিপজ্জনক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অপপ্রচার ঠেকাতে এখনই প্রয়োজন গণসচেতনতা, তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল প্ল্যাটফর্ম মনিটরিং। তা না হলে বিভ্রান্তির এই স্রোত গণতান্ত্রিক পরিবেশকে আরও গভীর সংকটে ঠেলে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্ক করে আরও বলেন, ভুয়া তথ্যের এই আগ্রাসন থামানো না গেলে সত্য ও মিথ্যার মাঝের সীমারেখা মুছে যাবে। আর গণভোট পরিণত হবে মতের লড়াই নয়, বরং বিভ্রান্তির এক বিপজ্জনক পরীক্ষায়।

