আগামীর সময়

পুনাখাকে এখনো মনে পড়ে

পুনাখাকে এখনো মনে পড়ে

ছবিঃ আগামীর সময়

ভুটানের রাজধানী শহর থিম্পু থেকে গাড়ি পুনাখার সীমানায় পৌঁছাতেই পাহাড় যেন হঠাৎ নরম হয়ে এলো। পথ সরু হলো, আলো নবদলে গেল। ডান পাশে ঝিরঝিরে স্বচ্ছ জল, পাথরের গায়ে রুপালি রেখা কেটে বয়ে চলেছে নদী। সেই নদীর ওপরে কাঠের সেতু, আর দূরে সবুজ উপত্যকার মাঝখানে ধবধবে সাদা-লাল এক স্থাপত্য, যেন পাহাড়ের বুকেই ভেসে আছে। এটাই পুনাখা জং, ভুটানের হৃদয়ের এক পুরোনো স্পন্দন।

আমার সফরসঙ্গী স্ত্রী পুনম আর পাঁচ বছরের মেয়ে ওয়াফিকা। গাইড-চালক নিডো, স্বাস্থ্যবান, সদা-হাসিখুশি। গাড়ি থামতেই ওয়াফিকার চোখ নদীতে। পাথরের ফাঁকে ফাঁকে মাছ কিলবিল করছে। আর আমার চোখ আটকে গেল জংয়ের দিকে। ১৬৩৭-৩৮ সালে শাবদ্রুং নাগওয়াং নামগ্যালের উদ্যোগে নির্মিত এই জং ভুটানের দ্বিতীয় প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ-ধর্মকেন্দ্র। একসময় এখানেই বসত দেশের রাজধানী; আজও শীতকালে ভুটানের কেন্দ্রীয় ধর্মীয় পরিষদ এখানে এসে অবস্থান করে। ভুটানের প্রথম রাজা গ্যলওয়াং উগ্যেন ওয়াংচুকের অভিষেকও হয়েছিল এখানেই।

জংয়ে ঢুকতে হয় কাঠের ছাউনি দেওয়া ঐতিহ্যবাহী সেতু পেরিয়ে। দুই পাশে দুই নদী—পো চু (পুরুষ নদী) আর মো. চু (স্ত্রী নদী)। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এদের মিলন মানে শক্তি ও মমতার মিলন। পো চু নেমে আসে হিমবাহ গলা বরফের পানি নিয়ে, আর মো চুর উৎস সুদূর তিব্বতের লাসা অঞ্চল। দুই স্রোত এসে আলিঙ্গন করেছে পুনাখা উপত্যকায়, আর সেই মিলনের মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আছে জং, সময়কে চ্যালেঞ্জ করে।

সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে প্রেয়ার হুইল ঘোরাতে গিয়ে পুনম ভুল করে উল্টো দিকে ঘুরিয়ে ফেলল। এক ভিক্ষু হেসে ঠিক দিক দেখালেন। ওয়াফিকাকে সেতু থেকে সরানো দায়, নদীর নিচের ঝকঝকে জল ও মাছ যেন তাকে মন্ত্রমুগ্ধ করেছে।
জংয়ের ভেতরে উঠোন, বৌদ্ধচিত্রে ভরা দেয়াল, সুউচ্চ প্রার্থনাগৃহ সবকিছুতেই এক ধরনের প্রশান্ত মহিমা। ভুটানি স্থাপত্যে কাঠের কারুকাজ, লাল-সোনালি রঙের ছোঁয়া আর নিখুঁত অনুপাত‌ এ যেন স্থাপত্য নয়, প্রার্থনারই পরিপূরক।

জং থেকে বেরিয়ে রওনা দিলাম ঝুলন্ত সেতুর দিকে। পাহাড়ের গা ঘেঁষে সরু পথ, দু’পাশে গাছপালা, হালকা শীতের রোদ। ওয়াফিকা দৌড়াচ্ছে মুক্তির আনন্দে। পথে একটা ছোট সিঁড়ি, কাঁটাতারের বেড়া পেরোতে। সেখানেই বুঝলাম, এই পথ শুধু পর্যটকের নয়; এ পথ গ্রামবাসীর প্রতিদিনের।
হঠাৎ সামনে ভেসে উঠল বিশাল এক দোলানো কাঠামো। ইউটিউবে দেখে ভক্ত হয়েছিলাম, সামনে এসে থ হয়ে গেলাম। এটাই পুনাখা সাসপেনশন ব্রিজ। ভুটানের দীর্ঘতম ঝুলন্ত সেতু, দৈর্ঘ্য প্রায় ১৮০ মিটার (৫০০ ফুটেরও বেশি)। সেতুটি সাং চু বা পো চু নদীর ওপর টানটান ইস্পাত তারে ঝুলে আছে।
পা রাখতেই দুলুনি। দুই পাশে অগণিত রঙিন প্রার্থনাপতাকা। নীল, সাদা, লাল, সবুজ, হলুদ। বাতাসে উড়ছে, যেন পাহাড়ি আকাশে প্রার্থনা পাঠাচ্ছে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই পতাকাগুলো অশুভ আত্মা দূরে রাখে, আর বাতাস যত বইবে, প্রার্থনা তত দূর ছড়িয়ে পড়বে।

নিচে নদী আরও মোহনীয়। দূরে রাফটিং করছে কয়েকজন অভিযাত্রী। ওপারে ধানক্ষেত, তার পরেই পাহাড়। মাঝে মাঝে গরুও সেতু পেরোয়, ওয়াফিকার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। সেতুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে মনে হলো, ভয় আর আনন্দ একসঙ্গে বুকে ঢেউ তুলছে।
ওপারে নেমে ছোট্ট এক প্রেয়ার হুইল। মা-মেয়ে ঘুরিয়ে নিল। পাশে কাঠের দুতলা বাড়ি, জানালায় বর্ণিল নকশা। এক বৃদ্ধ ফোকলা দাঁতে হাসলেন। ওয়াফিকা এক বিড়ালের সঙ্গে দুষ্টুমি জুড়ে দিল। হঠাৎ ছুটে এসে বলল, “বাপি, বিড়ালটা খামচি দিয়েছিল!” পরীক্ষা করে দেখি, মোটা জামা বাঁচিয়ে দিয়েছে। নিডো আশ্বস্ত করল, এখানকার পোষা প্রাণীর বেশিরভাগই টিকাপ্রাপ্ত।

ধানক্ষেতের ধারে দাঁড়িয়ে বুঝলাম, পুনাখা শুধু দর্শনীয় নয়, এটা বাসযোগ্য এক স্বপ্ন। আধসমতল সবুজ জমি, তার ওপরে ঢেউ খেলানো পাহাড়।

ফিরে এসে ক্ষুধা জানান দিল জোরে। নিডো আমাদের নিয়ে গেল উপত্যকার ভেতরে এক ছোট্ট রেস্তোরাঁয়। কাচের জানালার ওপারে পুনাখা উপত্যকা, ধানক্ষেত আর পাহাড়ের সখ্য। ডিম, মাশরুমের তরকারি, ডাল সাধারণ খাবারও অসাধারণ লাগছিল। ওয়াফিকার আইসক্রিমের আবদারও পূরণ হলো। মালিকান মহিলা হাসিমুখে ডিসকাউন্ট দিলেন, আমার চেহারা নাকি তার বোনজামাইয়ের মতো!
সন্ধ্যায় উঠলাম আমাদের হোটেলে—হোটেল কিনলে পুনাখা। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা হোটেলটি যেন উপত্যকার সঙ্গে মিশে গেছে। ব্যালকনিতে দাঁড়ালে মনে হয় নদীর ওপর ঝুলে আছি। নিচে স্রোত, তার পরেই ধানক্ষেত, তারপর শহর, আর সব শেষে পাহাড়ের দেয়াল।
রাতে শহরে ছোট্ট উৎসব, জাদু, খেলা, আলোর মেলা। নিডো জানাল, সে নদীর ওপারে বন্ধুর দাওয়াতে রাত কাটাবে। আমরা ফিরে এসে চাঁদের আলোয় উপত্যকা দেখলাম। ভোরে সূর্যের আলোয় পাহাড় সোনালি হয়ে উঠল।
সকালে পুনাখা ছাড়ার সময় মনে হলো, অন্তত আরেকটা দিন এখানে থাকা উচিত ছিল। ধানক্ষেতের আল ধরে হাঁটা হয়নি, নদীর ধারে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলা হয়নি।
পুনাখা আমাকে শিখিয়েছে, প্রকৃতির সৌন্দর্য কোলাহলে নয়, পরিচ্ছন্নতায় টিকে থাকে। ভুটানিরা তাদের পাহাড়-অরণ্যকে অবিশ্বাস্যরকম যত্নে রাখে। আমরা কি পারি না আমাদের সবুজ পাহাড়গুলোও তেমন করে আগলে রাখতে?
পো চু আর মো চুর মিলনের সেই সাদা-লাল জং আজও মনে ভাসে। মনে হয়, পৃথিবীর কোথাও যদি স্বপ্নের ঠিকানা থাকে, তার একটা নাম পুনাখা।

    শেয়ার করুন: