বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস
থ্যালাসেমিয়া কী, সচেতনতা কেন এতো গুরুত্বপূর্ণ

সংগৃহীত ছবি
আজ ৮ মে, ২০২৬। সারা বিশ্বের সাথে বাংলাদেশেও আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস। বংশগত এই রক্তের রোগটি নিয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করাই এই দিনের আসল উদ্দেশ্য। থ্যালাসেমিয়া মানে হলো শরীরে সুস্থ হিমোগ্লোবিন তৈরির ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, একদম সুস্থ বাবা-মায়ের ঘরেও কিন্তু জন্ম নিতে পারে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত সন্তান। কারণ অনেক সময় বাবা-মা দুজনেই এই রোগের জিন বহন করেন নিঃশব্দে। তাই শুধু সচেতনতা নয়, বরং রোগ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সময়ের দাবি।
আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সচেতনতা বিষয়টি এখনও অনেক বেশি জরুরি। হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ১০০ জনের মধ্যে অন্তত ৩ থেকে ৪ জন মানুষ অজান্তেই এই রোগের জিন শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন।বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ১১.৪ শতাংশ থ্যালাসেমিয়ার বাহক, যা ২০১৪-১৫ সালে ছিল ৭-৮ শতাংশ। বর্তমানে দেশে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আনুমানিক ৬০,০০০ থেকে ৭০,০০০ জন।
যখন দুইজন বাহক দম্পতি ঘর বাঁধেন, তখন তাদের সন্তানের থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মানোর ঝুঁকি থাকে ২৫ শতাংশ। বিয়ের আগে মাত্র একটি রক্ত পরীক্ষাই পারে একটি পরিবারের পুরো ভবিষ্যৎ বদলে দিতে।
এ বছর দিবসের প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়েছে শনাক্তহীন রোগীদের খুঁজে বের করা আর আড়ালে থাকা মানুষদের পাশে দাঁড়ানো। বিশেষ করে পাঞ্জাব, গুজরাট বা আমাদের এই বাংলা অঞ্চলেও এই রোগের প্রকোপ দেখা যায় অনেক বেশি। তাই পরিবারে যদি আগে থেকেই রক্তস্বল্পতার ইতিহাস থাকে, তবে বিয়ের আগেই পরীক্ষা করানো বুদ্ধিমানের কাজ।
এই বিশেষ দিনটি বেশ কিছু কারণে অনেক গুরুত্ব বহন করে। সাধারণ মানুষ থ্যালাসেমিয়াকে বংশগত ও প্রতিরোধযোগ্য রোগ হিসেবে এখনও অনেকে ঠিকঠাক চেনেন না। সামাজিক লোকলজ্জার কারণে অনেক পরিবার এই রোগ নিয়ে মুখ খুলতে চায় না। উন্মুক্ত আলোচনার মাধ্যমেই কেবল এই ভয় দূর করা সম্ভব।
সরকার ও বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংস্থা এই দিনে রক্তদান কর্মসূচি আর সাশ্রয়ী চিকিৎসার দাবি নিয়ে মাঠে নামে। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের যেহেতু সারা জীবন অন্যের দেওয়া রক্ত নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়, তাই তাদের অধিকার রক্ষা করাও আমাদের সবার দায়িত্ব।
থ্যালাসেমিয়া রোগের কিছু লক্ষণ কিন্তু আমরা চাইলেই সহজে চিনতে পারি। আক্রান্ত শিশুর বয়স দুই বছর হওয়ার আগেই তার শরীর ফ্যাকাসে হয়ে যেতে শুরু করে। শিশুটি সারাক্ষণ ক্লান্তি আর দুর্বলতায় ভোগে এবং তার স্বাভাবিক বৃদ্ধি থমকে যায়।
লিভার বা প্লীহা বড় হয়ে যাওয়ার কারণে অনেক সময় শিশুর পেট ফুলে ওঠে। এমনকি চেহারা বা চোখের রঙ হলুদ হয়ে জন্ডিসের মতো দেখা দিতে পারে। বড়দের ক্ষেত্রে অনেক সময় হালকা দুর্বলতা বা হিমোগ্লোবিন কম থাকাকে আমরা গুরুত্ব দেই না, যা আসলে থ্যালাসেমিয়ার লক্ষণ হতে পারে।
এই রোগটি প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ করা অনেক বেশি সহজ। জন্মের পর এই রোগ ঠেকানোর কোনো পথ নেই, কিন্তু জন্মের আগেই সচেতন সিদ্ধান্তে এটি রুখে দেওয়া যায়। বিয়ের আগে বা সন্তান নেওয়ার আগে একটি সাধারণ রক্ত পরীক্ষাই বলে দেবে আপনি এই রোগের বাহক কি না।
যদি স্বামী-স্ত্রী দুজনেই বাহক হন, তবে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ বা জেনেটিক কাউন্সেলিং নেওয়া উচিত। গর্ভাবস্থায় বিশেষ কিছু পরীক্ষার মাধ্যমেও জেনে নেওয়া যায় গর্ভের সন্তানটি সুস্থ আছে কি না। সময়মতো রোগ ধরা পড়লে উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে আক্রান্ত মানুষটিও দীর্ঘদিন সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে পারেন।
ভবিষ্যতে থ্যালাসেমিয়া মুক্ত সমাজ গড়তে আমাদের লড়াইটা শুধু চিকিৎসার নয়, বরং সামাজিক ও মানসিক। বাধ্যতামূলক রক্ত পরীক্ষা আর পাড়ায় পাড়ায় সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানোর কোনো বিকল্প নেই। সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই পারে এই মারাত্মক রোগের বিস্তার কমিয়ে আনতে।
থ্যালাসেমিয়া কোনো অভিশাপ নয়, বরং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিলে এটি পুরোপুরি প্রতিরোধযোগ্য। তাই আসুন, আজকের এই দিনে আমরা অঙ্গীকার করি, পরীক্ষা ছাড়া আর নয় কোনো বিয়ের বন্ধন।



