সবসময় ইতিবাচক থাকার চেষ্টা কি মানসিক বিপর্যয়ের কারণ

সংগৃহীত ছবি
বর্তমান সময়ে চারদিকে তাকালেই একটি শব্দ বারবার কানে আসে ‘পজিটিভ থিংকিং’ বা ইতিবাচক চিন্তা। সোশ্যাল মিডিয়ার নিউজফিড থেকে শুরু করে মোটিভেশনাল স্পিকারদের মঞ্চ, সবখানেই বলা হচ্ছে ‘সবসময় হাসিখুশি থাকুন’, ‘নেতিবাচকতাকে প্রশ্রয় দেবেন না’।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, সবসময় ইতিবাচক থাকার এই অদম্য চেষ্টা কি আমাদের অজান্তেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে? মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হচ্ছে ‘টক্সিক পজিটিভিটি’ বা বিষাক্ত ইতিবাচকতা।
মানুষের আবেগ বৈচিত্র্যময়। রাগ, দুঃখ, ভয় বা হতাশা এগুলো আনন্দের মতোই স্বাভাবিক অনুভূতি। কিন্তু যখন আমরা জোর করে নিজের কষ্টকে আড়াল করে মুখে হাসি ধরে রাখার চেষ্টা করি, তখন তা মনের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। গবেষকরা বলছেন, নিজের সত্যিকারের অনুভূতিগুলোকে বারবার অস্বীকার করলে মানসিক অস্থিরতা ও একাকিত্ব আরও বেড়ে যায়।
সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা শুধু মানুষের সাফল্যের এবং হাসিখুশি জীবনের গল্প দেখি। এই কৃত্রিম জগত আমাদের মনে এই ধারণা গেঁথে দেয় যে, সবসময় সুখে থাকাই জীবনের স্বাভাবিক নিয়ম। ফলে যখন কোনো মানুষ স্বাভাবিকভাবে ভেঙে পড়ে, তখন সে নিজেকে বাকিদের চেয়ে আলাদা বা ব্যর্থ ভাবতে শুরু করে। এই প্রতিযোগিতামূলক ইতিবাচকতাই আসলে আমাদের দীর্ঘমেয়াদী কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
মনোবিদদের মতে, ইতিবাচক থাকা মানেই নেতিবাচকতাকে অস্বীকার করা নয়। বরং জীবনের কঠিন সময়কে মেনে নিয়ে সেই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাওয়াটাই আসল সুস্থতা।
আপনার খারাপ লাগা বা মন খারাপ হওয়াটা একদম স্বাভাবিক। একে বিচার না করে গ্রহণ করুন। দুঃখ বা হতাশা স্বাভাবিক। এটিকে স্বীকার করাই স্বাস্থ্যকর।
নেগেটিভ বা কঠিন অনুভূতিকে লুকানোর চেষ্টা করলে মানসিক চাপ বাড়ে। ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’ না বলে ভাবুন, ‘পরিস্থিতি কঠিন, কিন্তু আমি এটি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি।’
সফল ও সুখী মানুষের গল্প দেখে নিজেকে তুলনা করলে ইতিবাচক থাকার প্রচেষ্টা কষ্টে রূপ নিতে পারে। নিজের গতিতে জীবন যাপন করা জরুরি।
নিজের আবেগের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো শিখুন। কখনও কখনও শুধু অনুভব করা এবং সময় নেওয়াই যথেষ্ট।
সফল এবং ইতিবাচক হওয়ার জন্য বাস্তবিক লক্ষ্য রাখুন। অযৌক্তিক আশা মানসিক ক্লান্তি বাড়ায়।
বিশ্বস্ত কারো কাছে নিজের কষ্টের কথা প্রকাশ করুন।
জীবন সাদা-কালোর মিশ্রণ। অন্ধকারকে অস্বীকার করে আলোর মাহাত্ম্য বোঝা অসম্ভব। তাই ইতিবাচক থাকার কৃত্রিম চাপে নিজেকে কষ্ট না দিয়ে বরং নিজের সবটুকু আবেগ নিয়ে স্বাভাবিকভাবে বাঁচাই হোক আমাদের লক্ষ্য। নিজেকে ভালো রাখার মানে এই নয় যে আপনাকে সবসময় হাসতেই হবে, মাঝে মাঝে ভেঙে পড়াটাও সুস্থতার লক্ষণ।



