আগামীর সময়

পদ্মায় বাস ডুবি

একটি ‘পাইপ’ বহু মানুষের বাঁচার পথকে বানাল ‘মৃত্যুর’ দেয়াল

একটি ‘পাইপ’ বহু মানুষের বাঁচার পথকে বানাল ‘মৃত্যুর’ দেয়াল

সংগৃহীত ছবি

রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ফেরিঘাটে পদ্মা নদীতে তলিয়ে যায় ‘সৌহার্দ্য’ পরিবহনের একটি বাস। ভয়াবহ এই দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত অন্তত ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। দুর্ঘটনার পর নতুন একটি বিষয় সামনে এসেছে, যা আগে তেমন গুরুত্ব পায়নি। বাসের জানালার মাঝখানে থাকা একটি এসএস পাইপ এখন আলোচনায়। অনেকেই বলছেন, এই পাইপ বাঁচার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

গত বুধবার বিকেল সোয়া ৫টার দিকে বাসটি পন্টুন থেকে নদীতে পড়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে বাসটি পানির নিচে তলিয়ে যেতে থাকে। ভেতরে থাকা যাত্রীরা তখন প্রাণ বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। অনেকেই জানালার কাঁচ ভেঙে বাইরে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু সমস্যাটা ছিল জানালার মাঝখানে লাগানো সেই পাইপ।

জানালার ওপরে ও নিচে কিছুটা ফাঁকা জায়গা থাকলেও, সেটি একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের বের হওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল না। ফলে যারা জানালার কাছে পৌঁছে ছিলেন, তারাও ঠিকমতো বের হতে পারেননি।

প্রত্যক্ষদর্শী ও উদ্ধার কাজে অংশ নেওয়া স্থানীয়দের দাবি, এই পাইপ না থাকলে অনেকেই হয়তো বেঁচে ফিরতে পারতেন।

এই বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনা শুরু হয়েছে। লেখক ও ধর্মীয় আলোচক মুফতি নাজমুল ইসলাম কাসেমী জানিয়েছেন, বাসে উঠলে তিনি নিজেও এই পাইপ দেখে ভাবেন, দুর্ঘটনা হলে বের হওয়া কতটা কঠিন হবে। তার মতে, শুধু পর্দা লাগানোর সুবিধার জন্য এমন একটি কাঠামো রাখা ঠিক নয়।

সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ রেজিঈ রাফিন সরকারও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি একটি গণমাধ্যমকে বলেছেন, এই পাইপ একটি বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি। দৌলতদিয়ার ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা এত বেশি হওয়ার পেছনে এই পাইপের ভূমিকা থাকতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।

তার মতে, এই ধরনের পাইপ থাকলে বাসের ফিটনেস বাতিল করার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।

তবে বিআরটিএ বলছে, এই পাইপ কোনো অনুমোদিত নকশার অংশ নয়। রাজবাড়ীতে বিআরটিএ-এর সহকারী পরিচালক (ইঞ্জি.) মুহাম্মদ অহিদুর রহমান জানিয়েছেন, বাস মালিকরা সাধারণত যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে, যেন কেউ জানালার বাইরে মাথা বা হাত না দেয় সেজন্য এই পাইপ লাগান। তবে দুর্ঘটনার সময় এটি যে সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে, সেটিও তারা অস্বীকার করছেন না।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল হক একটি গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘বাসের নকশা এমন হওয়া উচিত যাতে জরুরি অবস্থায় যাত্রীরা দ্রুত বের হতে পারেন। কিন্তু জানালার মাঝখানে এই ধরনের স্থায়ী পাইপ থাকলে তা বাঁচার পথকে সংকীর্ণ করে দেয়।’

তার মতে, এটি নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণযোগ্য নয় এবং বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা দরকার।

শুধু বাসের ভেতরের কাঠামোই নয়, ফেরিঘাটের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও এই দুর্ঘটনায় প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পন্টুনে যদি পর্যাপ্ত উচ্চতার গার্ড রেলিং থাকত, তাহলে বাসটি নদীতে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কম থাকত।

জানা গেছে, দুর্ঘটনার সময় বাসটিতে চালক, সুপারভাইজার ও সহকারীসহ অন্তত ৫০ জন ছিলেন। বিভিন্ন স্থান থেকে যাত্রী ওঠার পর বাসটি ঘাটে পৌঁছায় এবং হঠাৎ করেই নদীতে পড়ে যায়। বিকাল সোয়া ৫টার দিকে দুর্ঘটনা ঘটলেও উদ্ধার কাজ শুরু হয় রাত সাড়ে ৯টার দিকে। এরপর একে একে উদ্ধার করা হয় নিথর দেহগুলো।

এই দুর্ঘটনা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছে, আমাদের গণপরিবহন কতটা নিরাপদ? একটি ছোট পাইপ, যা হয়তো অনেকের কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি, সেটিই এমন একটি পরিস্থিতিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে, সেজন্য এখনই সচেতন হওয়া প্রয়োজন। 

    শেয়ার করুন: