আগামীর সময়

দেশে প্রথমবারের মতো সফল পেকটাস-ইটিএস সমন্বিত অস্ত্রোপচার

দেশে প্রথমবারের মতো সফল পেকটাস-ইটিএস সমন্বিত অস্ত্রোপচার

বাংলাদেশের চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একই রোগীর শরীরে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে ‘পেকটাস এক্সকাভাটাম’ ও ‘ইটিএস’ এর সমন্বিত বা যুগপৎ অস্ত্রোপচার। রাজধানীর গ্রীন লাইফ হাসপাতালে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী ‘পেকটাস ওয়ার্কশপ ২০২৬’-এর প্রথম দিনে এই অভাবনীয় সাফল্য অর্জিত হয়।

গতকাল সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) কর্মশালার প্রথম দিনে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরের ওপর সফলভাবে সম্পন্ন হয় একটি বিরল ও জটিল অস্ত্রোপচার। জন্মগতভাবে সে ‘পেকটাস এক্সকাভাটাম’ বা বক্ষপ্রাচীর বিকৃতির সমস্যায় ভুগছিল।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, পেকটাস এক্সকাভাটাম এমন একটি অবস্থা, যেখানে বুকের মাঝখানের অংশ ভেতরের দিকে দেবে যায়। এর ফলে হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এর পাশাপাশি ওই কিশোর ‘হাইপারহাইড্রোসিস’ বা অতিরিক্ত ঘামজনিত সমস্যায়ও আক্রান্ত ছিল, যা তার দৈনন্দিন জীবনকে চরমভাবে দুর্বিষহ করে তুলেছিল।

থাইল্যান্ড থেকে আসা আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দল ও বাংলাদেশের অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে এই জটিল অস্ত্রোপচারটি সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়।

চিকিৎসকরা জানান, একই সঙ্গে দুটি অস্ত্রোপচার করায় রোগীর দীর্ঘদিনের দুটি বড় শারীরিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব হয়েছে। এতে একদিকে রোগীর অজ্ঞান হওয়ার ঝুঁকি যেমন কমেছে, তেমনি অস্ত্রোপচার-পরবর্তী জটিলতার সম্ভাবনাও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

এই বিশাল কর্মযজ্ঞের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন দেশের বরেণ্য থোরাসিক সার্জন অধ্যাপক ডা. এ.কে.এম. রাজ্জাক। আয়োজনে আন্তর্জাতিক ফ্যাকাল্টি হিসেবে অংশ নিতে থাইল্যান্ড থেকে আসেন ভাজিরা হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ও খ্যাতনামা থোরাসিক সার্জন ডা. সিরা লাওহাথাই। বাংলাদেশে এই বিরল ও আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির প্রসারে তাঁদের ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

পুরো ওয়ার্কশপ এবং এই বিশেষ অস্ত্রোপচারের সার্বিক তত্ত্বাবধান ও সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন গ্রীন লাইফ হাসপাতালের থোরাসিক সার্জারি বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. তাজদীত রহমান তানিম।

ওয়ার্কশপের দ্বিতীয় দিন, মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি), আরও একটি সফল পেকটাস সার্জারি সম্পন্ন হয়। একই দিনে পেকটাস সার্জারির আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি, সম্ভাবনা এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল নিয়ে একটি বিশেষ অ্যাকাডেমিক সেশন (সিএমই) অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা অংশ নেন।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় ‘গ্রীন লাইফ চেস্ট ওয়াল ক্লিনিক’। এটি বাংলাদেশে বক্ষপ্রাচীরসংক্রান্ত যেকোনো জটিল রোগের উন্নত ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার জন্য একটি বিশেষায়িত সেবা কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ওয়ার্কশপ এবং চেস্ট ওয়াল ক্লিনিকের যাত্রা বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। এর ফলে এখন থেকে জটিল বক্ষ বিকৃতির আধুনিক চিকিৎসা দেশেই সম্ভব হবে এবং রোগীদের আর বিদেশমুখী হতে হবে না। একই সঙ্গে এটি ভবিষ্যতে চিকিৎসা প্রশিক্ষণ ও গবেষণার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

    শেয়ার করুন: