আগামীর সময়

টাইমসের প্রতিবেদন

তারেক রহমানকে অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতেই হবে

তারেক রহমানকে অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতেই হবে

সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশে বসন্ত এসেছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় পাওয়ার দুই দিন পর। ২০২৪ সালের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে কর্তৃত্ববাদী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর যে প্রথম নির্বাচন হলো, সেখানে নিষেধাজ্ঞার কারণে তার দল আওয়ামী লীগকে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি।

নির্বাচনের ফল আরেকটি বিষয় স্পষ্ট করেছে— ইসলামপন্থী জামায়াতে ইসলামী বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের পর থেকে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিই পালাক্রমে শাসন করেছে ঢাকা। কখনো ক্ষমতায় না থাকা এবং দুর্নীতির অভিযোগ তুলনামূলক কম থাকা জামায়াত পশ্চিমাঞ্চলে, বিশেষ করে ভারতের সীমান্তবর্তী তুলনামূলক দরিদ্র এলাকায় বেশি সমর্থন পেয়েছে, যেখানে শিল্প ও কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ কম হয়েছে।

সংসদে শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি সরকার শুরুতে সহজেই আইন পাস করতে পারবে। কিন্তু অর্থনীতিতে ব্যর্থ হলে তারা একদিকে শক্তিশালী হয়ে ওঠা জামায়াত, অন্যদিকে সুপ্ত আওয়ামী সমর্থকদের চাপে পড়বে। চাকরি ও দুর্নীতি নিয়ে তরুণদের অসন্তোষ সহজে কমবে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। তবে তার সাফল্য নির্ভর করবে অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করার ওপর।

আসল বিষয় অর্থনীতি

বিএনপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ২০৩৪ সালের মধ্যে অর্থনীতির আকার প্রায় ৪৬০ বিলিয়ন ডলার থেকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করবে। এই লক্ষ্য অর্জনে বছরে প্রায় ৯ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। এটি কঠিন কারণ বর্তমানে প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। দলটি শিক্ষা খাতে জিডিপির ২ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশে এবং স্বাস্থ্য খাতে ০.৭৫ শতাংশে থেকে ৫ শতাংশে ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু এত উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য পূরণে অর্থ জোগাড়ের বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা এখনো নেই। প্রবৃদ্ধি দ্বিগুণের বেশি করতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগ ২৩ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশে তুলতে হবে।

গত দেড় বছরে উচ্চ সুদহার নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের সমালোচনা হয়েছে। অনেকেই বলছেন, শুধু মুদ্রানীতি নয়, সরবরাহ ব্যবস্থার কাঠামোগত সমস্যার কারণেই খাদ্যের দাম বেশি। এটিই তারেক রহমান সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। জিডিপির ১২ শতাংশ আসে কৃষি থেকে এবং বাংলাদেশের প্রায় ৫ কোটি মানুষ (কর্মসংস্থানের ৪৪ শতাংশ) এই খাতে যুক্ত। শহরে খাদ্যের দাম কমাতে এবং কৃষকদের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে হলে প্রধানমন্ত্রীকে খামার থেকে শহর পর্যন্ত খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাবশালী, অনিয়ন্ত্রিত মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। পাশাপাশি ফসল কাটার পর সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যবস্থায় বিনিয়োগ জরুরি।

বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্সও বড় ভরসা। প্রায় ১ কোটি বাংলাদেশি বিদেশে কাজ করেন, বেশিরভাগই উপসাগরীয় দেশে। তিন মাসে তাদের পাঠানো প্রায় ৭.৫ বিলিয়ন ডলার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পুরো সহায়তা প্যাকেজের সমান।

২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অনেক প্রবাসী হুন্ডি ছেড়ে ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠাতে শুরু করেন। ফলে রেমিট্যান্স ২০২৩ সালের ২১ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৫ সালে ৩০ বিলিয়ন ডলারে ওঠে। ৯ বিলিয়ন ডলারের এই বৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের বার্ষিক পোশাক রপ্তানির চেয়েও বেশি। যদি অনানুষ্ঠানিক চ্যানেল আবার বাড়ে, বাংলাদেশ ব্যাংক এই বৈদেশিক মুদ্রা দ্রুত হারাতে পারে।

প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখ মানুষ বিদেশে কাজের জন্য যান, যেখানে দেশে বছরে ২০ লাখ নতুন চাকরিপ্রার্থী তৈরি হয়। এই সুযোগ না থাকলে জনসংখ্যাগত সুবিধা বড় সংকটে পরিণত হতে পারে। তবে শ্রম রপ্তানি খাতে দুর্নীতি ও শোষণ বড় সমস্যা। কয়েকটি দেশ ইতিমধ্যেই বাংলাদেশি শ্রমিক নেওয়া বন্ধ করেছে, ফলে সৌদি আরবের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন বিষয়ক একটি প্রতিবেদনের নেতৃত্ব দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ খান আহমেদ সাঈদ মুরশিদ। দেশে সামগ্রিক সংস্কারের বিষয়ে তিনি বাস্তববাদী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, বিএনপির উচিত বড় পরিকল্পনা মাথায় রাখা, তবে জরুরি বাস্তবায়নের জন্য ‘উচ্চ-প্রভাবশালী ছোট ছোট প্রকল্পে’র দিকেও দৃষ্টিপাত করা। শিল্পের জন্য নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত এবং দুর্বল আর্থিক খাত সংস্কারও জরুরি। ২০২৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে যাবে, ফলে শুল্ক সুবিধা কমে যাবে। এটিও বড় চ্যালেঞ্জ।

ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মাঝে

অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কও জড়িত। বিএনপি তাদের ইশতেহারে আসিয়ানে যোগদানের ইচ্ছা জানিয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের সামনে প্রথম বক্তব্যে তারেক রহমান দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) কথা বলেন, যা তার বাবা জিয়াউর রহমান শুরু করেছিলেন। কিন্তু সার্ক এখন প্রায় নিষ্ক্রিয়। গত বছর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, তাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সঙ্গে উপমহাদেশের সার্বিক আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যও অন্যতম অনুঘটক।

বাংলাদেশের সীমানা মিয়ানমারের সঙ্গে, যা আসিয়ানের সদস্য। এছাড়া ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে রয়েছে। আসিয়ানে যোগ দিলে সরবরাহ শৃঙ্খল বৈচিত্র্যময় হবে এবং বিদেশি বিনিয়োগ বাড়তে পারে।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের স্থলসীমান্ত দীর্ঘতম। ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন বেড়েছে। ভিসা ও ক্রীড়া বিনিময় বন্ধ হয়েছে। বিএনপি তার প্রত্যর্পণ চায়। তবে ভারতের প্রতি ব্যাপক ক্ষোভ ও অবিশ্বাসের প্রেক্ষাপটে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হলে বিএনপিকে সতর্কভাবে এগোতে হবে। দিল্লির বিরুদ্ধে একপেশে চুক্তি চাপিয়ে দেওয়ারও অভিযোগ আছে, বিশেষ করে আদানি গ্রুপের সঙ্গে বিদ্যুৎ চুক্তি। এই গ্রুপটির সঙ্গে ভারত সরকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে এবং তারা বাংলাদেশের ১৫ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করে।

দিল্লির উচিত হবে আমদানির ক্ষেত্রে অশুল্ক বাধাগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো অথবা ভাটির দেশ বাংলাদেশের দিকে পানির ন্যায্য প্রবাহে একমত হওয়া। এই ফ্রন্টগুলোর কোনোটিতেই দিল্লির নমনীয় হওয়ার সম্ভাবনা কম হওয়ায় ভবিষ্যতে দুই দেশের যেকোনো সমঝোতা সীমিত থাকবে বলে মনে হয়।

অপরদিকে চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। বছরে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য দুই দেশের। বাংলাদেশের অবকাঠামো বিনিয়োগেও চীন বড় ভূমিকা রাখছে। বেইজিং ঢাকার প্রধান প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহকারীও বটে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার এবং জ্বালানি খাতে বড় বিনিয়োগকারী। যুক্তরাষ্ট্র ইঙ্গিত দিয়েছে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে তারা সহযোগিতা করবে। সম্প্রতি বেইজিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশে একটি ড্রোন তৈরির কারখানা স্থাপনের চুক্তি করেছে ঢাকা। এছাড়াও বেইজিং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে ২৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

জাতীয় নির্বাচনের কয়েক দিন আগে ঢাকায় নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বলেন, তিনি নতুন সরকারের সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার ‘ঝুঁকিগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরবেন।’ তার এ বক্তব্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে বেইজিংয়ে। ক্রিস্টেনসেন ইঙ্গিত দেন, ওয়াশিংটন সামরিক সহযোগিতার মাধ্যমে যে ‘সুযোগ-সুবিধা’ অফার করে থাকে, তার ওপর জোর দেবে। মার্কিন কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা যাচাই করছে। এ ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার যে বিনিয়োগবান্ধব, সে বিষয়ে তারেক রহমান সরকারের সুস্পষ্ট ইঙ্গিতের অপেক্ষায় আছেন তারা।

বাংলাদেশের অভিজাত শ্রেণির রাজনৈতিক ঝোঁক পশ্চিমের দিকে হলেও তারা জানেন অবকাঠামো বিনিয়োগ এসেছে মূলত এশিয়া থেকে। বিশেষ করে জাপান ও চীন সেতু, বন্দর ও রেলপথ নির্মাণে বড় প্রকল্পে নেতৃত্ব দিচ্ছে। বেইজিং নদীর পানি সঞ্চয় করে সেচ কাজে সহায়তার জন্য ১ বিলিয়ন ডলারের একটি প্রকল্পে অর্থায়নের প্রস্তাব দিয়েছে। গত বছর ১৪৩টি চীনা কোম্পানির একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করে গেলেও তারা অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রমে খুব একটা সন্তুষ্ট হতে পারেনি। চীনা ব্যবসায়ীরা এখন নতুন সরকারের সংকেতের অপেক্ষায়।

অপরদিকে তারেক রহমান যদি যুক্তরাষ্ট্রকে ইতিবাচক বার্তা দেন, তবে মার্কিন ব্যবসায়ীদের দ্রুত এগোতে হবে। না হলে তিনি চীনের দিকেই ঝুঁকতে পারেন। সরকারের প্রধান হিসেবে এই চ্যালেঞ্জ বিশাল। তবে সুযোগও আছে। তারেক রহমান যদি সঠিক অগ্রাধিকার ঠিক করতে পারেন তবে তিনি অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করে বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা আনতে পারেন।

    শেয়ার করুন: