দেশে আইসিইউ এবং ভেন্টিলেশন সেবা কতটা আছে?

ফাইল ছবি
আইসিইউ ও ভেন্টিলেশন সেবা না পেয়ে বেশ কিছু শিশুর মৃত্যু হয়েছে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় বিভাগ রাজশাহীতে। চলতি মাসেই রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভেন্টিলেশনসহ আইসিইউ সুবিধার অভাবে মৃত্যু হয়েছে ৩৩ শিশুর । তাদের মধ্যে হামে আক্রান্ত ছিল ১০ থেকে ১২টি শিশু ।
এছাড়া, এ মাসে রাজশাহীতে এ রোগে আক্রান্ত ৮০টি শিশুকে চিকিৎসকরা আইসিইউতে নেওয়ার সুপারিশ করলেও সবাইকে সেই সুবিধা দেওয়া সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। শিশুমৃত্যুর ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে এরই মধ্যে ওই হাসপাতালে ভেন্টিলেশন মেশিন দেওয়ার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
দেশের হাসপাতালগুলোতে আইসিইউর সংখ্যা কত?
দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে কী পরিমাণ আইসিইউ বেড, ভেন্টিলেটর মেশিন ও এ সংক্রান্ত জরুরি সেবা রয়েছে, সে বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে ন্যাশনাল ইলেকট্রো মেডিকেল ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার। সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটির প্রধান টেকনিক্যাল ম্যানেজার জয়ন্ত কুমার মুখোপাধ্যায় বলেছেন, সারাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ বেড রয়েছে মাত্র এক হাজার ৬২০টি। আর বেসরকারি হাসপাতালে এ সংখ্যা ঠিক কত সে তথ্য দিতে পারেননি তিনি। একইসাথে জানা যায়নি হাসপাতালগুলোতে থাকা ভেন্টিলেটর মেশিনের সংখ্যা।
সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ সেবা সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেছে চিকিৎসা সংক্রান্ত গবেষণা জার্নাল বাংলাদেশ ক্রিটিক্যাল কেয়ার জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায়। ২০২২ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত ‘ক্রিটিক্যাল কেয়ার বেড ক্যাপাসিটি অব বাংলাদেশ: অ্যা প্রি অ্যান্ড পোস্ট কোভিড-১৯ প্যানডেমিক সার্ভে’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ বেডের সংখ্যা ২৮৫৬টি। তবে, কোভিড মহামারির পরে আইসিইউ বেডের সংখ্যা কিছুটা বেড়ে এখন প্রায় তিন হাজারের কাছাকাছি বলে জানিয়েছেন আইসিইউ বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকরা।
২০১৭ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত পরিচালিত এক আন্তর্জাতিক গবেষণার কথা উল্লেখ করে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য ক্রিটিক্যাল কেয়ার বা আইসিইউ বেড ছিল মাত্র শূন্য দশমিক সাতটি। এ সংখ্যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশ কম।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল বিভাগের পরিচালক আবু হোসেইন মো. মইনুল আহসানের ভাষ্য, ‘সত্যি কথা বলতে, এ মুহূর্তেও যদি বিদ্যমান আইসিইউর সংখ্যা দ্বিগুণ করি- তাও আমাদের প্রয়োজন মিটবে না।’
পৃথিবীর কোনো দেশেই পর্যাপ্ত আইসিইউ থাকে না বলে দাবি করে এ কর্মকর্তা বলেছেন, ‘এটা কিন্তু গ্লোবাল ইস্যু। পৃথিবীর কোনো দেশেই পর্যাপ্ত আইসিইউ থাকে না। কোভিডের সময় ইউরোপে যারা মারা গেছে, তারা আইসিইউর অভাবেই মারা গেছে। ইভেন আমেরিকায় যারা মারা গেল তাদের বড় অংশও আইসিইউর অভাবে মারা গেছে।’
পেডিয়াট্রিক আইসিইউ কী?
দেশে এডাল্ট অর্থাৎ প্রাপ্ত বয়স্ক ও নিওনেটাল বা সদ্যজাত শিশুর জন্য আইসিইউ থাকলেও পেডিয়াট্রিক তথা অল্পবয়েসী শিশুদের জন্য আইসিইউ স্বল্পতা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা। ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ কনসালটেন্ট ও বিভাগীয় প্রধান আশরাফ জুয়েল বলেছেন, ‘বাংলাদেশে এটা খুব রুড রিয়েলিটি যে, যেভাবে এডাল্ট আইসিইউ ও নিওনেটাল আইসিইউ হয়েছে সেভাবে হয়নি পেডিয়াট্রিক আইসিইউ।’
‘জন্মের পর থেকে ২৮ দিন পর্যন্ত নিওনেটাল বা সদ্যোজাত শিশুর জন্য নিওনেটাল আইসিইউ বেড প্রয়োজন হয়। এটি একটি ছোট্ট কটের মতো বেডের আকারের হয় এবং এতে জায়গা খুব কম লাগে বলে সংখ্যায় বেশি রাখা যায়। বাংলাদেশে মোট আইসিইউর প্রায় ২৫ শতাংশই নিওনেটাল আইসিইউ বেড,’- বলছিলেন তিনি।
‘যেসব শিশুর বয়স ১৩ বা ১৪ বছর এবং ওজন ৫০ কেজির নিচে তাদের সাধারণত পেডিয়াট্রিক আইসিইউতে চিকিৎসা করা হয়। অফিসিয়ালি ১৮ বছর পর্যন্ত শিশুদের এই বেডে চিকিৎসা করা হয়। পেডিয়াট্রিক আইসিইউগুলোতে এডাল্ট আইসিইউর বেডের মতোই সব ধরনের ফ্যাসিলিটিজ থাকা উচিত। অক্সিজেন, মনিটর, ভেন্টিলেটরসহ অন্য যেসব ফ্যাসিলিটিজ থাকে তা থাকতে হবে। তবে, দেশে মোট আইসিইউ বেডের মাত্র তিন শতাংশের মতো এই পেডিয়াট্রিক আইসিইউ,’- যোগ করেন তিনি।
হামের রোগীকে কি আইসিইউ ও ভেন্টিলেশন দিতে হয়?
হাম একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা অত্যন্ত দ্রুত ছড়ায় মিজলস ভাইরাসের মাধ্যমে। একজন আক্রান্ত শিশু বা প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি তার চারপাশের ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে বলে জানান চিকিৎসকরা। এটি মূলত হাঁচি-কাশির মাধ্যমে, অর্থাৎ রেসপিরেটরি ড্রপলেট দিয়ে ছড়ায়।
বিআরবি হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক এবং নিওনেটোলোজি বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. আয়েশা পারভীন বলেছেন, ‘হাম খুবই ছোঁয়াচে একটি রোগ। তীব্র তাপমাত্রার জ্বর শুরুর তিন থেকে চারদিন পর শরীরে লাল লাল র্যাশ হয়। আর হামের সাথে অন্যান্য জটিলতা তৈরি হলেই আইসিইউ সেবা প্রয়োজন হয়। যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, যেমন সাধারণত এক বছরের নিচে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, ক্যান্সার পেশেন্ট বা যারা বিভিন্ন থেরাপি নেন এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে হামের পরে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।’
তার ভাষ্য, ‘হাম হলে সবসময় আইসিইউ লাগে না। তবে, যদি হামের সাথে বাচ্চার কমপ্লিকেটেড নিউমোনিয়া হয়ে যায়, যখন বাচ্চার প্রচণ্ড পরিমাণ শ্বাসকষ্ট হয় ও অক্সিজেন সাপোর্ট লাগে, অথবা ব্রেনের কোনো প্রদাহজনিত রোগে বাচ্চা আক্রান্ত হয়- তখন আইসিইউ সাপোর্ট লাগবে।’
‘যদি কোনো শিশু তীব্র শ্বাসকষ্টের কারণে অক্সিজেন নিতে না পারে তখন তাকে ভেন্টিলেটর মেশিনের মাধ্যমে অক্সিজেন সাপোর্ট দেওয়া হয়। নিউমোনিয়া আক্রান্ত হলে ফুসফুস ঠিকমতো কাজ না করলে তখন ভেন্টিলেশন দেওয়া হয়’,- বলছিলেন ডা. আয়েশা পারভীন।

