পাট খাতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের নেপথ্যে

সংগৃহীত ছবি
দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত ও লোকসানে জর্জরিত পাট খাত হঠাৎ করেই আবারও শেয়ারবাজারের আলোচনায় উঠে এসেছে। গত ৭ মে সমাপ্ত সপ্তাহে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সবচেয়ে বেশি রিটার্ন দিয়েছে পাট খাত। খাতটির গড় দরবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। বাজারের সামগ্রিক সূচক দুর্বল থাকলেও পাট খাতের বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ারে অস্বাভাবিক ক্রয়চাপ দেখা গেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কম মূলধনী ও কম ফ্রি-ফ্লোটের কোম্পানিগুলোতে স্বল্প সময়ে দর বাড়ানোর যে প্রবণতা বর্তমানে বাজারে দেখা যাচ্ছে, পাট খাত তার অন্যতম উদাহরণ। বিশেষ করে লোকসানি বা দুর্বল মৌলভিত্তির শেয়ারেও হঠাৎ করে অস্বাভাবিক লেনদেন ও দরবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। এ খাতের বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারে গত কয়েক সপ্তাহে উল্লেখযোগ্য দরবৃদ্ধি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হলেও শেয়ারের চাহিদা বেড়েছে দ্রুত।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাট খাতের অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার সংখ্যা তুলনামূলক কম। ফলে অল্প পরিমাণ ক্রয়াদেশেই এসব শেয়ারের দাম দ্রুত বাড়ানো সম্ভব হয়। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে বড় মূলধনী শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমে যাওয়ায় অনেক স্বল্পমূলধনী শেয়ারে জল্পনাভিত্তিক বিনিয়োগ বেড়েছে।
একাধিক ব্রোকারেজ হাউজের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, যেসব খাতে দীর্ঘদিন লেনদেন কম ছিল, সেসব খাতেই এখন হঠাৎ করে টাকা ঢুকছে। পাট খাত তার মধ্যে অন্যতম। তাদের মতে, বাজারে এখন মৌলভিত্তির চেয়ে ‘মোমেন্টাম ট্রেডিং’ বেশি প্রভাব ফেলছে। অর্থাৎ যেসব শেয়ারের দর দ্রুত বাড়ছে, বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ সেগুলোতেই ঝুঁকছেন।
বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পাট খাত একসময় দেশের প্রধান রপ্তানি আয়ের উৎস ছিল। স্বাধীনতার পর কয়েক দশক পর্যন্ত সোনালি আঁশ অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু সিনথেটিক পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া, ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত মিলগুলোর লোকসানের কারণে ধীরে ধীরে সংকটে পড়ে খাতটি।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, পাট খাতের বেশ কয়েকটি কোম্পানি দীর্ঘ সময় ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে। অর্থাৎ তারা নিয়মিত লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে একসময় বিনিয়োগকারীদের কাছে খাতটি ছিল উচ্চঝুঁকিপূর্ণ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবেশবান্ধব ও বায়োডিগ্রেডেবল পণ্যের চাহিদা বাড়ায় পাটপণ্যের সম্ভাবনা আবারও আলোচনায় এসেছে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন দেশে প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়ছে।
তবে বাস্তবতা হলো— শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ পাট কোম্পানি এখনো সেই সম্ভাবনাকে আর্থিক সফলতায় রূপ দিতে পারেনি। ফলে বর্তমান দরবৃদ্ধিকে অনেকে মৌলভিত্তিক উত্থানের চেয়ে স্বল্পমেয়াদি জল্পনা হিসেবেই দেখছেন।
বাজার বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, কম ফ্রি-ফ্লোট ও কম লেনদেনের শেয়ারে হঠাৎ দরবৃদ্ধি যেমন দ্রুত হয়, তেমনি পতনও হতে পারে দ্রুত। অতীতে বহুবার দেখা গেছে, স্বল্প সময়ে অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির পর এসব শেয়ারে বড় ধরনের সংশোধন এসেছে।
তাদের মতে, পাট খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের আগে কোম্পানির উৎপাদন সক্ষমতা, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি, নগদ প্রবাহ ও লভ্যাংশ ইতিহাস বিশ্লেষণ করা জরুরি।



