আগামীর সময়

মাইক্রো-স্লিপ

পথের মৃত্যুদূত ৩ থেকে ৩০ সেকেন্ডের তন্দ্রা

পথের মৃত্যুদূত ৩ থেকে ৩০ সেকেন্ডের তন্দ্রা

ছবিঃ আগামীর সময়

আনন্দে টইটম্বুর একটি পরিবার মুহূর্তেই ডুবে গেল গভীর বিষাদে। নতুন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে চার চাকার ছোট্ট মাইক্রোবাসে চড়ে কনের বাড়ি খুলনার কয়রা থেকে ফিরছিলেন নবদম্পতি, সঙ্গে আত্মীয়-স্বজন। হঠাৎ বাগেরহাটের রামপালে বিপরীত দিক থেকে দ্রুতগতিতে ছুটে আসা বাস কেড়ে নিল তাদের সবটুকু আনন্দ। কয়েক দিন আগে ঘটে যাওয়া এই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন একই পরিবারের ১৩ জনসহ মোট ১৪ জন। রঙিন পোশাকে থাকা নববধূ ও বরের নিথর দেহ ঢাকা পড়ে শোকের চাদরে।

অভিযোগ উঠেছে, সেই অভিশপ্ত মুহূর্তে চালকের চোখের এক পলকের তন্দ্রা বা ‘মাইক্রো-স্লিপ’ কেড়ে নিয়েছে একঝাঁক প্রাণ, কয়েকটি সাজানো সংসার ঠেলে দিয়েছে চিরস্থায়ী ঘোর অন্ধকারে। যেখানে বাজার কথা ছিল উৎসবের সানাই, সেখানে এখন কেবলই স্বজন হারানো দীর্ঘশ্বাস।

এই প্রাণহানি কেবল একটি সড়ক দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড। উৎসবের আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে একটি পুরো পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার এই দৃশ্য সইবার ক্ষমতা কোনো সভ্য মানুষেরই থাকার কথা নয়। প্রাথমিক তদন্ত ও পারিপার্শ্বিক আলামত যে তথ্যটি সামনে এনেছে তা হলো, চালকের চোখের এক পলকের তন্দ্রা বা মাইক্রো-স্লিপ ঘটিয়েছে এই মহাপ্রলয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই তন্দ্রার দায় কি কেবল চালকের, নাকি আমাদের গোটা পরিবহনব্যবস্থার? নাকি রাষ্ট্রের?

মহাসড়কে চালকদের ক্লান্তি ও ঘুম নিয়ে বরাবরই উদাসীন রাষ্ট্রযন্ত্র এবং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা। একজন চালককে বিশ্রামহীন ১২-১৪ ঘণ্টা স্টিয়ারিং ধরে রাখতে বাধ্য করা হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, ৩ থেকে ৩০ সেকেন্ডের এই মাইক্রো-স্লিপ বা ক্ষণিকের তন্দ্রা মূলত মস্তিষ্কের চরম অবসাদের ফল। যখন একজন চালক পর্যাপ্ত ঘুম ছাড়া গাড়ি চালান, তখন মস্তিষ্ক কয়েক সেকেন্ডের জন্য শাট-ডাউন হয়ে যায়। ১০০ কিলোমিটার গতির একটি গাড়ি এই কয়েক সেকেন্ডেই নিয়ন্ত্রণহীনভাবে পাড়ি দেয় প্রায় ১১০ মিটার, যা খেলার মাঠের চেয়েও বড়।

রামপালের ঘটনায় ব্রেক না কষে সরাসরি মুখোমুখি সংঘর্ষের ধরন প্রমাণ করে চালক সেই মুহূর্তে সজাগ ছিলেন না। সংঘর্ষের তীব্রতা এতটাই ছিল যে মাইক্রোবাসটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী চালকদের জন্য নির্ধারিত কর্মঘণ্টার তোয়াক্কা না করাই এই ‘মাইক্রো-স্লিপ’ নামের এই নীরব মৃত্যুদূতকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে।

সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামাতে বারবার সংশোধন হয়েছে আইন, সাজা বাড়িয়েছে সরকার। কিন্তু তা প্রয়োগের বেলায় চিত্রটা উল্টো। দূরপাল্লার পথে ‘ডাবল ড্রাইভার’ বা বিকল্প চালক রাখার বাধ্যবাধকতা থাকলেও মানছে না মালিকপক্ষ। বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে মহাসড়কে চালকদের বিশ্রামের জন্য পর্যাপ্ত ‘রেস্ট এরিয়া’ বা বিশ্রামাগারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা উঠলেও বাস্তবে তা আজও স্বপ্ন। ফলে ক্লান্তি নিয়ে স্টিয়ারিং ধরা চালকেরা নিজেদের অজান্তেই হয়ে উঠছেন একেকজন মৃত্যুদূত।

কেবল তদন্ত কমিটি গঠন আর শুধুই কিছু ফাঁকা বুলিতে এই মৃত্যুমিছিল থামবে না। মহাসড়কে চালকের কর্মঘণ্টা সুনির্দিষ্ট করা, ফিটনেসবিহীন গাড়ির চলাচল রোধ এবং চালকদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের নিয়মিত তদারকি এখন সময়ের দাবি। রামপালের এই ট্র্যাজেডি যেন কেবলই একটি পরিসংখ্যান হয়ে সরকারের আরও অন্য বহু নথির ভিড়ে হারিয়ে না যায়। সড়কের অদৃশ্য যমদূত ‘মাইক্রো-স্লিপ’ রুখতে হলে বৈজ্ঞানিক ও প্রশাসনিক কঠোর পদক্ষেপের কোনো বিকল্প নেই। নতুবা আমাদের উন্নয়নের রাজপথগুলো এভাবেই সাধারণ মানুষের রক্তে রঞ্জিত হতে থাকবে।

রামপাল দুর্ঘটনার তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, মাইক্রোবাসের চালক নাঈম শেখ কয়েক দিন ধরে বিশ্রামহীনভাবে গাড়ি চালাচ্ছিলেন। মানুষের শরীর প্রাকৃতিকভাবেই ঘুমের দাবি জানায়, তখন স্টিয়ারিং হাতে থাকা একজন ক্লান্ত চালক কয়েক সেকেন্ডের জন্য চোখ বুঁজে ফেলেন, তখন তাকে থামানোর সাধ্য কারও থাকে না। একেই চিকিৎসাবিজ্ঞানে বলা হয় ‘মাইক্রো-স্লিপ’। এটি এতটাই দ্রুত ঘটে যে ব্যক্তি নিজেও বুঝতে পারেন না তিনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। গাড়ি চালানোর সময় চালকের চোখ খোলা থাকলেও মস্তিষ্ক সাময়িকভাবে বাইরের উদ্দীপনা গ্রহণ বন্ধ করে দেয়।

রামপালের ঘটনায় রাস্তায় কোনো ব্রেক মার্ক বা টায়ার ঘর্ষণের চিহ্ন না থাকা প্রমাণ করে মুখোমুখি সংঘর্ষের ঠিক আগ মুহূর্তে চালক সজাগ ছিলেন না। আর এখানেই প্রশ্ন ওঠে দেশের বিদ্যমান আইনের প্রয়োগ নিয়ে।

সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ অনুযায়ী, একজন চালক টানা ৫ ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালাতে পারবেন না এবং দিনে ৮ ঘণ্টার বেশি ডিউটি নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অতিরিক্ত মুনাফার আশায় মালিকপক্ষ এবং বেশি আয়ের আশায় চালকরা এই নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন। বিশেষ করে ঈদ বা পূজার মতো উৎসব বা বিয়ের মৌসুমে চালকদের বিশ্রামের ফুসরত মেলে না। রামপাল ট্র্যাজেডির ক্ষেত্রেও নাঈম শেখ ছিলেন এই অপব্যবস্থারই শিকার। এটি কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং কর্মঘণ্টা সংক্রান্ত আইনি অবহেলার করুণ পরিণতি।

দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি হয়, আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়, কিন্তু মূল সমস্যাটি অধরাই থেকে যায়। মহাসড়কগুলোয় চালকদের বিশ্রামের জন্য পর্যাপ্ত ‘রেস্ট এরিয়া’ নেই, নেই কোনো কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা। হাইওয়ে পুলিশ বা বিআরটিএর পক্ষ থেকে চালকদের লগবুক বা কাজের সময় যাচাইয়ের সংস্কৃতি দেশে গড়ে ওঠেনি। ফলে ক্লান্ত শরীর নিয়ে চালকরা যখন মহাসড়কে নামেন, তখন তাদের হাতের মুঠোয় থাকা যানটি হয়ে উঠে ‘চলমান মৃত্যুফাঁদ’।

রামপালের এই ‘দুর্ঘটনা’ থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকারকে এখনই কঠোর হতে হবে। কেবল চালককে দায়ী করে এই দায় এড়ানো সম্ভব নয়। চালকদের নির্ধারিত কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করতে মালিকপক্ষকে আইনের আওতায় আনতে হবে। মহাসড়কের নির্দিষ্ট দূরত্বে বাধ্যতামূলক বিশ্রামের ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল তদারকি জোরদার সময়ের দাবি। অন্যথায় ‘মাইক্রো-স্লিপ’ নামের এই নীরব মৃত্যুদূত একের পর এক প্রাণ কেড়ে নিতেই থাকবে, আর আমরা কেবল শোক প্রকাশ করেই দায় শেষ করব।

ঈদ উৎসব সামনে রেখে শিকড়ের টানে মানুষের ঘরে ফেরার এই দিনগুলো হোক নিরাপদ, আর কোনো পরিবার যেন রামপালের মতো এভাবে তছনছ হয়ে না যায়।

সড়কে মাইক্রো-স্লিপ বা চালকের অবচেতন ঝিমুনির কারণে ঘটা দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান পাওয়া বেশ জটিল, কারণ বেশিরভাগ সময়ই একে ‘নিয়ন্ত্রণ হারানো’ বা ‘বেপরোয়া গতি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয় তদন্ত প্রতিবেদনে। তবে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সড়ক নিরাপত্তা সংগঠনের গবেষণা এবং দেশে গত কয়েক বছরে ঘটা দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণ করলে ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। দেশে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় যত মানুষ মারা যায়, তার মধ্যে ২০% থেকে ২৫% দুর্ঘটনার নেপথ্যে সরাসরি চালকের তন্দ্রাচ্ছন্নতা দায়ী।

হাইওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাক বা বাসের পেছনে সজোরে ধাক্কা দেওয়ার ঘটনার প্রায় ৯০% ঘটে চালক ঘুমিয়ে পড়ার কারণে। এসব ক্ষেত্রে রাস্তায় টায়ারের ঘর্ষণের চিহ্ন পাওয়া যায় না, যা প্রমাণ করে চালক ব্রেক চাপার সুযোগই পাননি।

দূরপাল্লার বাসের প্রায় ৮৩% চালক দিনে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত গাড়ি চালান। দীর্ঘ সময় একটানা স্টিয়ারিং ধরে থাকায় তাদের মস্তিষ্কে মাইক্রো-স্লিপের ঝুঁকি বেড়ে যায় ৩০০ শতাংশ।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য বলছে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ৯০% ঘটে চালকের ভুল বা ত্রুটির কারণে। যার একটি বড় অংশ হলো একটানা গাড়ি চালানো এবং পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব।

পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, অধিকাংশ বড় দুর্ঘটনা ঘটে রাত ২টা থেকে ভোর ৬টার মধ্যে এবং দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে। আর এই সময়েই মূলত মানবদেহে ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ বা ঘুমের চক্রের কারণে মাইক্রো-স্লিপের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি থাকে।

একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশে দূরপাল্লার বাস ও ট্রাক চালকদের প্রায় ৮৩ শতাংশই মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত এবং ক্লান্তিতে ভোগেন। এই ক্লান্তির কারণেই গাড়ি চালানোর সময় তারা ২ থেকে ৩০ সেকেন্ডের জন্য অবচেতনভাবে ঘুমিয়ে পড়েন।

মাদারীপুরের শিবচরে ২০২৩ সালের এক সকালে এক্সপ্রেসওয়েতে যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে প্রাণ হারান ১৯ জন, আহত হন আরও ৩০ জন। ওই ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির ধারণা ছিল, চালক ঝিমুনি আসায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিলেন।

একই বছরের ৭ জুন ভোরে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের নাজিরবাজারে ট্রাক ও নির্মাণ শ্রমিকবাহী পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই ১১ জনসহ মোট নিহত হয়েছিলেন ১৫ জন। হাইওয়ে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে দেখা যায়, ট্রাক চালক রাতভর গাড়ি চালিয়ে ভোরে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন। ফলে ট্রাকটি লেনের বাইরে গিয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা পিকআপটিকে সরাসরি চাপা দেয়।

দেশের সবচেয়ে ব্যস্ততম ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে গত দুই বছরে অন্তত ১০টি বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে, যেগুলোয় বাস বা ট্রাক রাস্তার পাশের আইল্যান্ডে উঠে গেছে অথবা খাদে পড়েছে। এসব বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৪৫ জন। যদিও সরকারি নথিতে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে সরাসরি ‘মাইক্রো-স্লিপ’ লেখা হয়নি, তবে দুর্ঘটনার ধরন দেখে বিশেষজ্ঞরা একে মাইক্রো-স্লিপ হিসেবে চিহ্নিত করেন।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে দুর্ঘটনাগুলো ঘটেছে রাত ৩টা থেকে ভোর ৬টার মধ্যে। চালকদের জবানবন্দি এবং বেঁচে যাওয়া সহকারীদের মতে, দীর্ঘ সময় বিরতিহীন গাড়ি চালানোর ফলে শেষ রাতে তাদের চোখ লেগে গিয়েছিল। অনেক দূরপাল্লার বাসে মাত্র একজন চালক ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম বা সিলেট গিয়ে আবার সঙ্গে সঙ্গেই ট্রিপ নিয়ে ফিরে আসেন। এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছাতে চালকদের ওপর মানসিক চাপ থাকে, যা তাদের শরীর অতি-ক্লান্ত করে ফেলে।

এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের সড়কে ২০২৩ সালে ঘটা ৭ হাজার ৯০২টি দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ৭ হাজার ৯০৩ জনের। যার মধ্যে ১৯.৫% ছিল চালকের তন্দ্রা/ক্লান্তিজাত দুর্ঘটনা। ২০২৪ সালের ৬ হাজার ৩৫৯টি দুর্ঘটনায় প্রাণ যায় ৮ হাজার ৫৪৩ জনের। যার মধ্যে ১৮%-২২% ছিল একই কারণে। আর ২০২৫ সালের ৬ হাজার ৭২৯টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ৯ হাজার ১১১ জন। এর মধ্যে ২০%- ২৫% ছিল চালকের তন্দ্রা/ক্লান্তিজাত দুর্ঘটনা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ ঘুমে মানুষ আওয়াজ পেলে জাগতে পারে, কিন্তু মাইক্রো-স্লিপে চালকদের মস্তিষ্ক এমনভাবে ‘অফ’ হয়ে যায় যে সামনের বিপদ দেখেও পা ব্রেকের কাছে যায় না বা ব্রেক কষতে সাড়া দেয় না।

মাইক্রো-স্লিপ রোধে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে গাড়িতে ‘ড্রাইভার ড্রাউজিনেস ডিটেকশন সিস্টেম’ থাকলেও বাংলাদেশে এর ব্যবহার নেই। তাই দীর্ঘযাত্রায় প্রতি দুই ঘণ্টা পর পর বিরতি নেওয়াই জীবন বাঁচানোর একমাত্র উপায় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ও যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৪০% থেকে ৪২% ঘটে রাত ১২টা থেকে ভোর ৬টার মধ্যে। আর ২০% থেকে ২৫% মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনার নেপথ্যে চালকের ক্লান্তি এবং ‘মাইক্রো-স্লিপ’ প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।

এক জরিপে দেখা গেছে, দূরপাল্লার বাস ও ট্রাক চালকদের প্রায় ৮৩% পর্যাপ্ত ঘুম ছাড়াই নিয়মিত গাড়ি চালান, যা তাদের মাইক্রো-স্লিপের ঝুঁকিতে ফেলে।

দেশে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চালকদের অতিরিক্ত কর্মঘণ্টাকে দায়ী করেছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমেদ।

‘আইন অনুযায়ী একজন চালক দিনে সর্বোচ্চ আট ঘণ্টা গাড়ি চালানোর কথা থাকলেও বাস্তবে অনেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত স্টিয়ারিংয়ে থাকছেন। এই অতিরিক্ত চাপের কারণেই দুর্ঘটনার ঝুঁকি ভয়াবহভাবে বেড়ে যাচ্ছে’, সম্প্রতি ময়মনসিংহে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতদের পরিবারের মাঝে চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে এমনটাই বলছিলেন তিনি।

বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন আইনের বিধি অনুযায়ী একজন চালক একটানা ৫ ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালাতে পারবেন না। ৫ ঘণ্টা পর কমপক্ষে ৩০ মিনিটের বিশ্রাম বাধ্যতামূলক। আবার দৈনিক মোট কর্মঘণ্টা কোনোভাবেই ৮ ঘণ্টার বেশি হওয়া চলবে না। এই আইনের ৪৭ ধারা অনুযায়ী, চালককে বিশ্রাম না দিয়ে টানা কাজে বাধ্য করলে নিয়োগকর্তাও সমান অপরাধী। যদি কোনো মালিক বা চালক এই নির্ধারিত কর্মঘণ্টা অমান্য করেন, তবে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এই বিধান লঙ্ঘনের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অনধিক ৩ মাস কারাদণ্ড অথবা অনধিক ৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে। আইনে এমন কঠোর বিধান থাকলেও এর প্রয়োগে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র।

রামপাল ট্র্যাজেডি আবারও প্রমাণ করল, কাগজে-কলমে আইন থাকলেও প্রয়োগের অভাবে সড়কে ঝরছে প্রাণ। চালক নাঈম শেখ নিজেও এই দুর্ঘটনার শিকার, তবে তার ক্লান্তিজনিত ভুল কেড়ে নিয়েছে নববধূ ও বরসহ একই পরিবারের আরও ১৩টি প্রাণ। নাঈমের স্ত্রী কবিতা, মেয়ে নওশীন। বিয়ের ট্রিপ পেয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মেয়েকে আদর করে স্ত্রী কবিতাকে বলেছিলেন, ফিরে সবার জন্য ঈদের কেনাকাটা করব।

নাঈম ফিরেছেন। তবে কেনাকাটা না, শেষ বিদায়ের যাত্রা করতে। তবে নাঈমই শেষ নয়,  ঈদের আগে-পরে আরও অনেকেই আনন্দযাত্রায় নেমে সফেদ কাফনে শেষযাত্রার যাত্রী হবেন।

    শেয়ার করুন: