এমপির কান্নাতেও মেলে না— কোথায় গলদ?

মনিরুল হক চৌধুরী
ঈদ আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত দেশবাসী। এর মধ্যে কুমিল্লার পদুয়া বাজার রেলক্রসিংয়ে ঝরল ১২ প্রাণ। ট্রেনের সঙ্গে যাত্রীবাহী বাসের সংঘর্ষে আহত হলো অন্তত ১০ জন। শনিবার রাতের এ ঘটনায় শোকের ছায়া নামতে দেরি হয়নি।
মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনার ঘণ্টা কয়েক পরে রেল ও সড়কমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমকে ফোন করেন কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা ‘নতুন কিছু নয়’ জানিয়ে কাঁদতে কাঁদতে মন্ত্রীকে মনিরুল বলছিলেন, ‘গত ১০০ বছর ধরে এমন ঘটনা ঘটছে, কেউ বিচার করে না। আমি চেষ্টা করেছি সাধ্যমত।’
‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রেল সচিবের কাছে সব কাগজপত্র আছে। পদুয়ার বাজার ব্যারিকেডে ম্যাডাম (খালেদা জিয়া) টাকা দিয়েছিল, লুট করে খেয়ে ফেলেছে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়। এই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের জন্য ৭৫০ কোটি টাকা দিয়েছিল সাইফুর রহমান, এই কাজটি কমপ্লিট করতে পারিনি।’
কান্নারত সেই কথোপকথনের ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়। এরপরই নতুন আলোচনার জন্ম দেয় এই কথোপকথন। শুরু হয় চুলচেরা বিশ্লেষণ। এমপি আসলে কেঁদে কেঁদে রেলমন্ত্রীর কাছে কী সহযোগিতা চেয়েছিলেন— জড়িতদের শাস্তি, না অবকাঠামোগত স্থায়ী সমাধান?
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু এই দুর্ঘটনা নয়, রেলকর্মীদের অবহেলায় একের পর এক বড় ধরনের ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটছে। কুমিল্লার এ দুর্ঘটনাসহ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে গত আট বছরে আটটি বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত অন্তত ২১৮ জন।
এরপরই নতুন প্রসঙ্গ হয়ে আসে এমপির ‘জড়িতদের কেউ বিচার করে না’ কথাটি। কারণ আগের দুর্ঘটনায় জড়িতদের যথোপযুক্ত শাস্তি হলে এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি হত না। বিচার চেয়ে এমপির এই কান্না পুরো দেশের জবাবদিহিতার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন— নিয়মিত পরিদর্শন ও কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত হলে একই ভুল বারবার ঘটত না। পাশাপাশি জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হলে দায়িত্বে গাফিলতি হত না।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সব দায় শুধু মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ওপর চাপানো ঠিক নয়। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, বাজেট ঘাটতি এবং পুরোনো প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে অনেক সময় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। রেল দুর্ঘটনা কমাতে হলে গাফিলতির দায় নিরূপণের পাশাপাশি প্রযুক্তি উন্নয়ন, জনবল বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ ও জবাবদিহিতা— সবকিছু সমন্বিতভাবে জোরদার করা ছাড়া বিকল্প নেই। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে সক্রিয় হতে হবে।
আজ সোমবার ট্রেনের ধাক্কায় বাসের ১২ জন যাত্রী নিহত হওয়ার ঘটনায় মামলা হয়েছে। এতে রেলক্রসিংয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী মো. হেলাল ও মেহেদী হাসানকে আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া রেলক্রসিংয়ের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অজ্ঞাতনামা হিসেবে আসামি করা হয়েছে। গত শনিবার গভীর রাতের ওই ঘটনার পর ওই দুজনকে বরখাস্ত করে রেলওয়ে বিভাগ।
আগের মতো দায়িত্ব গাফিলতি করে পার পেয়ে যাবে, না দৃশ্যমান শাস্তি হবে— সেটার জন্য কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

