দেশে এক বছরে ধর্ষণ বেড়েছে ২৭ শতাংশ

প্রতীকী ছবি
দেশে গত এক বছরে ধর্ষণের মামলা বেড়েছে ২৭ শতাংশের বেশি। এ সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলার সংখ্যা বেড়েছে ২৫ শতাংশ। গত বছর নারী নির্যাতনের যত মামলা হয়েছে, প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ধর্ষণের অভিযোগের।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে সারা দেশে মামলা হয়েছে ২১ হাজার ৯৩৯টি। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় ৯টি অভিযোগে মামলা করা যায়। সেগুলো হলো ধর্ষণ ও ধর্ষণের কারণে মৃত্যু, বিয়ের প্রলোভনে যৌন সম্পর্ক স্থাপন, যৌন পীড়ন, যৌতুক, আত্মহত্যায় প্ররোচনা, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, ভিক্ষাবৃত্তির উদ্দেশ্যে শিশুর অঙ্গহানি, দহনকারী পদার্থ দিয়ে সংঘটিত অপরাধ।
২০২৫ সালে হওয়া মামলার মধ্যে ৭ হাজার ৬৮টি মামলা ধর্ষণের অভিযোগের। ভুক্তভোগীদের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক নারী ৫ হাজার ১৭১ জন ও শিশু ১ হাজার ৮৯৭টি। ২০২৪ সালের তুলনায় গত বছর নারী নির্যাতনের মামলার সংখ্যা ২৫ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৪ সালে ১৭ হাজার ৫৭১টি মামলা হয়। এর মধ্যে ধর্ষণের মামলা ছিল ৫ হাজার ৫৬৬টি। তার আগে ২০২৩ সালে ১৮ হাজার ৯৪১টি, ২০২২ সালে ২১ হাজার ৭৬৬টি ও ২০২১ সালে ২২ হাজার ১৩৬টি মামলা হয়েছিল নারী নির্যাতনের অভিযোগে।
অতি সম্প্রতি পাবনায় দাদিকে হত্যা করে কিশোরী নাতনিকে ফসলের খেতে টেনে নিয়ে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়েছে। নরসিংদীতে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণের শিকার একটি মেয়ের পরিবার বিচার চেয়েছিল স্থানীয়ভাবে। মেয়েটি পরে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়।
একইভাবে সীতাকুণ্ডে সাত বছরের শিশুকে যৌন সহিংসতার পর গলা কেটে দেওয়া হয়। রক্তাক্ত শিশুটি জঙ্গল থেকে একা হেঁটে বের হয়েছিল, যা দেখে অনেকে শিউরে ওঠেন। দেড় দিন লড়াইয়ের পর হাসপাতালে মৃত্যু হয় শিশুটির।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী সাবেক প্রেমিকের ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। মব সহিংসতার ধারাবাহিকতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়ও ঘটে গেছে নারী নিপীড়নের ঘটনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দুই তরুণীকে কিল-ঘুষি ও লাথি মারেন আরেক শিক্ষার্থী। এরপর আরো ঘটনা ঘটেছে। ৩ মার্চ সাহরি খেতে ওঠার সময় কক্সবাজারের উখিয়ায় বাড়িতে ঢুকে গৃহবধূকে দলবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়। ঘটনাস্থলেই গৃহবধূর মৃত্যু হয়।
নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয় বলে মনে করেন নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন। তিনি গত ২৪ ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে তাঁর কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা ও বিদ্বেষমূলক আচরণ বন্ধ করা শুধু সরকারের একার কাজ নয়, এটা সবার দায়িত্ব। এটা মোকাবিলায় সম্মিলিত সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। নারীর মর্যাদা রক্ষার জন্য সবার সচেতন হওয়া প্রয়োজন। নারীকে মর্যাদার জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করতে প্রথম সারির গণমাধ্যমগুলো বড় ভূমিকা পালন করতে পারে।
উচ্চ আদালতের তথ্য অনুসারে, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশের ৯৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ১ লাখ ৩২ হাজার ১০৭টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে ৫ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৩০ হাজার ৩৬৫টি। ঢাকার ৯টি ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ১১ হাজার ৫৬৭টি। ৫ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন ৩ হাজার ৯১টি মামলা।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভীন হক সাংবাদিকদের বলেন, ‘নারীর ওপর সহিংসতা, সহিংসতার হুমকি, নিপীড়ন, হেনস্তা যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। নারীর ওপর খবরদারি করতে পারার প্রবণতার একটা পর্যায় হচ্ছে নারীর ওপর সহিংসতা। পুরুষের আত্মবিশ্বাস রয়েছে যে নারীর ওপর সহিংসতা করার তার অধিকার আছে এবং সে পার পেয়ে যাবে।’
নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে বড় রকমের সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়ে শিরীন পারভীন বলেন, এ আন্দোলনের মূল বার্তা হবে—নারীকে মানুষ হিসেবে চিনুন, জানুন, সম্মান করুন। নারীর ওপর সহিংসতা জাতীয় সমস্যা হিসেবে মনে করতে হবে সরকারকে। জরুরি অবস্থা ঘোষণার সময় যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সেভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে।
অন্যদিকে নারী নির্যাতনের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন আইনজীবী সারা হোসেন। তাঁর মতে, মামলার ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর আর্থিক, আইনি ও স্বাস্থ্যগত সহায়তা দরকার। ওয়ান–স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার ও সেলগুলোকে নিজস্ব অর্থায়নে ব্যাপকভাবে পরিচালনার জন্য বড় কর্মসূচি নেওয়া দরকার। শুধু বিচারপ্রক্রিয়া তদারকি না করে তদন্তপ্রক্রিয়ার দিকেও নজর দেওয়া দরকার।
তিনি আরো বলেন, বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে তদন্ত কাজ শেষ করা হচ্ছে কি না, দেখতে হবে। মামলায় পুলিশ ও চিকিৎসকের মতো পেশাদার সাক্ষীরা অনেক সময় আসেন না। অনেকে বদলি হয়ে যান। তাঁদের আসা-যাওয়ার কোনো খরচও দেওয়া হয় না। এ বিষয়টা সমন্বয় করা দরকার। সাক্ষী সুরক্ষা জরুরি।

