ফেব্রুয়ারিতে কারা হেফাজতে ১৩ জনের মৃত্যু

সংগৃহীত ছবি
মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) দেওয়া তথ্য মতে, সদ্য বিদায়ী ফেব্রুয়ারি মাসে হেফাজতে থাকা অবস্থায় মোট ১৩ জন বন্দীর মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৪ জন কয়েদি ও ৯ জন হাজতি। মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৫ হাজতি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মী ছিলেন।
গতকাল শনিবার ফেব্রুয়ারি মাসের মানবাধিকার প্রতিবেদন দেয় এমএসএফ। প্রতিষ্ঠানটি কয়েকটি সংবাদপত্র এবং নিজস্ব অনুসন্ধানের ওপর ভিত্তি করে এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ৩ জন কয়েদি ও বগুড়া জেলা কারাগারে ১ জন কয়েদি মারা যান। কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ৪ জন, এ ছাড়া চট্টগ্রাম জেলা কারাগারে, কুষ্টিয়া জেলা কারাগারে, ঠাকুরগাঁও জেলা কারাগার, গাইবান্ধা জেলা কারাগারে ও পটুয়াখালী জেলা কারাগারে ১ জন করে হাজতি বন্দী মারা যান। হাজতি মৃত্যুর ঘটনায় কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ও কুষ্টিয়া জেলা কারাগারে ১ জন করে মোট ২ জন হাজতি কারা অভ্যন্তরে আত্মহত্যা করেছেন। আত্মহত্যাকারী বন্দী ছাড়া সব বন্দীর মৃত্যু হয় কারাগারের বাইরের হাসপাতালে।
প্রতিবেদনটি আরও বলেছে, কারা অভ্যন্তরে চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নতির পাশাপাশি, বন্দীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে হেফাজতে মৃত্যুর কারণ যথাযথভাবে তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা হলে এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের দিন বড় কোনো সহিংসতার ঘটনা না ঘটলেও নির্বাচনের ও গণভোটের ফলাফল ঘোষণার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত সহিংসতা, প্রাণহানি, রাজনৈতিক ও পূর্বশত্রুতাজনিত হামলা, সংঘর্ষ, নারী নির্যাতন এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এমএসএফ বলেছে, নির্বাচনী সহিংসতার ১৩৬টি ঘটনায় সহিংসতার শিকার হয়েছেন ৭৯৯ জন। সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে শিশুসহ ৫ জন নিহত এবং ৭৯৪ জন আহত হয়েছেন।
সংগঠনটি বলেছে, সহিংসতার ১৩৬টি ঘটনার মধ্যে নির্বাচনের আগে সংঘটিত ৬৫টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৩৮৫ জন, নির্বাচনের দিন সহিংসতার ১৪টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৯৮ জন ও নির্বাচন–পরবর্তী সহিংসতার ৫৭টি ঘটনায় শিশুসহ ৫ জন নিহত ও ৩১১ জন আহত হয়েছেন।
এমএসএফের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি মাসে অন্তত ৩১টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ১৮ জন নিহত ও ৩৩ জন গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। গণপিটুনির শিকার ১৫ জনকে আহত অবস্থায় পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে। গণপিটুনিতে নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৪ জন ছিনতাইয়ের অভিযোগে, ৭ জন চুরির অভিযোগে, ৫ জন বাগ্বিতণ্ডার জেরে, ১ জনকে মাদক ব্যবসার অভিযোগে হত্যা করা হয়। অপর দিকে ১১ জন চুরির অভিযোগে, ৯ জন ছিনতাইয়ের অভিযোগে, ৪ জনকে টাকা লেনদেনের জেরে এবং কটূক্তি, প্রতারণা, এ ধরনের অপরাধের কারণে ৯ জনকে গণপিটুনি দিয়ে গুরুতর আহত করা হয়।
এমএসএফ মনে করে, আইন অবজ্ঞা করে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা অবশ্যই ফৌজদারি অপরাধ, যা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবেই গণ্য করা হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে গণপিটুনির সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের চিহ্নিত করে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব।
ফেব্রুয়ারি মাসে আগের মাসগুলোর ধারাবাহিকতায় অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধারের ঘটনা ঘটে চলে। অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধারের ঘটনা জনজীবনের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি জোরালোভাবে সবার সামনে উঠে আসছে বলে মনে করে এমএসএফ। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা লাশের পরিচয় উদ্ধারে অপারগতায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। গত মাসে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ১ জন শিশু, ১১ জন নারী ও ৪২ জন পুরুষ মিলিয়ে মোট ৫৪টি অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার হয়েছে। অল্পসংখ্যক ঘটনা ছাড়া সব কটি লাশের পরিচয় অজ্ঞাতই থেকে যাচ্ছে। জানুয়ারি মাসে এ সংখ্যা ছিল ৫৭। এসব অজ্ঞাতনামা লাশের বেশির ভাগই নদী বা ডোবায় ভাসমান, মহাসড়ক বা সড়কের পাশে, সেতুর নিচে, রেললাইনের পাশে, ফসলি জমিতে ও পরিত্যক্ত স্থানে পাওয়া যায়।
এমএসএফের প্রতিবেদনে বলা হয়, ফেব্রুয়ারিতে সারা দেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও সরকারের পতন–সংক্রান্ত বিভিন্ন মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের ৪০ জন নেতা–কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যাঁদের মধ্যে কোটা–সংক্রান্ত আন্দোলনকে কেন্দ্র করে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সূত্র : প্রথম আলো

